প্রিন্ট এর তারিখ : ০৮ জুলাই ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ০৭ জুলাই ২০২৬
ইসলামী ঋণ,এর আড়ালে ডিজিটাল ডাকাতি: অনলাইন লোন অ্যাপের ভয়ংকর ফাঁদ
মোঃ বিল্লাল হোসাইন, অনুসন্ধানী প্রতিবেদক ||
বর্তমান সময়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও ইন্টারনেটে বিভিন্ন ওয়েবসাইট এবং মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে "সহজ শর্তে ঋণ", "সুদবিহীন ইসলামী ঋণ" বা "ঝামেলাহীন লোন" দেওয়ার চটকদার বিজ্ঞাপন আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। ‘ইসলামী ঋণ ডট কম’ সহ এমন অসংখ্য নাম সর্বস্ব প্ল্যাটফর্ম কোনো জামানত ছাড়াই মুহূর্তের মধ্যে হাজার হাজার টাকা লোন দেওয়ার প্রলোভন দেখাচ্ছে।আপাতদৃষ্টিতে একে সাধারণ মানুষের জন্য আশীর্বাদ মনে হলেও, অনুসন্ধানে জানা গেছে এর পেছনে লুকিয়ে আছে এক ভয়ংকর ডিজিটাল ব্ল্যাকমেইলিং ও প্রতারণার জাল, যার শিকার হয়ে এদেশের হাজার হাজার মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত মানুষ আজ সর্বস্বান্ত হচ্ছে।প্রতারণার ভয়ংকর কৌশল: সাধারণ মানুষকে ফাঁদে ফেলা হয়------এই চক্রগুলো মূলত তিনটি ধাপে সাধারণ মানুষকে নিঃস্ব করে ফেলে-----(১) ধর্মীয় অনুভূতি ও সরলতার সুযোগ নামের ফাঁদ। বাঙালি মুসলিমদের ধর্মীয় অনুভূতিকে পুঁজি করতে এরা নামের সাথে "ইসলামী" বা "সুদবিহীন" শব্দ ব্যবহার করে। সুদ এড়াতে গিয়ে সাধারণ মানুষ সহজেই এদের পাতা ফাঁদে পা দেয়।(২) অগ্রিম ফি বা ট্যাক্সের নামে টাকা আত্নসাৎ : লোন দেওয়ার নাম করে এরা শুরুতেই বলে, "আপনার ৫০,০০০ টাকা লোন পাস হয়েছে, কিন্তু ফাইল প্রসেসিং বা সরকারি ট্যাক্স বাবদ ৩,০০০ বা ৫,০০০ টাকা বিকাশ/নগদে অগ্রিম পাঠাতে হবে।" সাধারণ মানুষ লোনের আশায় এই টাকা পাঠানোর সাথে সাথেই তারা যোগাযোগ বন্ধ করে দেয় এবং নম্বর ব্লক করে দেয়।আরও পড়ুন, দর বৃদ্ধিতে চাঙা ডিএসই, শুরুতেই ৩২৫ কোটি টাকার লেনদেন(৩) মোবাইল হ্যাক ও ব্ল্যাকমেইলিং (সবচেয়ে বিপজ্জনক) : যদি কোনো অ্যাপের মাধ্যমে তারা সামান্য কিছু টাকা (যেমন: ২,০০০ বা ৩,০০০ টাকা) লোন দেয়ও, অ্যাপটি ইনস্টল করার সময় ব্যবহারকারীর অজান্তেই তার ফোনের কন্টাক লিস্ট (যোগাযোগ তালিকা), গ্যালারির ব্যক্তিগত ছবি এবং ভিডিও'র অ্যাক্সেস চুরি করে নেয়।ঋণ নেওয়ার মাত্র ৫ থেকে ৭ দিন পরই তারা অস্বাভাবিক হারে (কখনো কখনো ১০০%) 'সার্ভিস চার্জ' বা সুদ দাবি করে। টাকা দিতে দেরি হলে ব্যবহারকারীর ব্যক্তিগত ছবি এডিট করে বিকৃত করা হয় এবং তা তার আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধুবান্ধবদের কাছে পাঠিয়ে সামাজিক মর্যাদাহানি করার হুমকি দিয়ে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়। মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে অনেক ভুক্তভোগী আত্মহত্যার পথও বেছে নিয়েছেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের আইন অনুযায়ী, যেকোনো ধরনের ব্যাংকিং বা আর্থিক লেনদেন (লোন দেওয়া বা নেওয়া) করার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের লাইসেন্স থাকা বাধ্যতামূলক। কোনো বৈধ ব্যাংক বা লাইসেন্সপ্রাপ্ত আর্থিক প্রতিষ্ঠান ফেসবুক বিজ্ঞাপন দেখে বা হুট করে কোনো অ্যাপের মাধ্যমে জামানত ছাড়া লোন দেয় না। এই লোন অ্যাপ বা ওয়েবসাইটগুলো সম্পূর্ণ অবৈধ, অনুমোদনহীন এবং সাইবার অপরাধ চক্রের অংশ।সাধারণ মানুষের প্রতি জরুরি সতর্কবার্তা: নিজেকে যেভাবে নিরাপদ রাখবেন----১. লোভের ফাঁদে পা দেবেন না: ইন্টারনেট বা ফেসবুকে "জামিনদার ছাড়া লোন", "নিমিষেই ঋণ" বা "ইসলামী ঋণ" এর বিজ্ঞাপন দেখলেই তা এড়িয়ে চলুন।২. অগ্রিম টাকা দেবেন না: লোন দেওয়ার আগে কেউ যদি প্রসেসিং ফি বা অন্য কোনো নামে ১ টাকাও অগ্রিম চায়, তবে নিশ্চিত জানবেন সেটি প্রতারক চক্র।৩. অপরিচিত অ্যাপ ইনস্টল করবেন না: গুগল প্লে স্টোর বা বাইরের কোনো সোর্স থেকে সন্দেহজনক লোন অ্যাপ ফোনে নামাবেন না। অ্যাপ নামানোর সময় কন্টাক্ট লিস্ট বা গ্যালারির পারমিশন চাইলে তা কখনোই দেবেন না।৪. ব্যক্তিগত তথ্য শেয়ার করবেন না: কোনো অপরিচিত ওয়েবসাইট বা অ্যাপে আপনার জাতীয় পরিচয়পত্র (NID), জন্ম নিবন্ধন বা ব্যাংক অ্যাকাউন্টের তথ্য সাবমিট করবেন না।প্রতারিত হলে করণীয়:যদি আপনি ইতিমধ্যে এই ধরনের কোনো চক্রের শিকার হয়ে থাকেন বা ব্ল্যাকমেইলিংয়ের মুখোমুখি হন, তবে ভয় না পেয়ে অবিলম্বে নিচের পদক্ষেপ গুলো নিন:নিকটস্থ থানায় যোগাযোগ করে সাধারণ ডায়েরি (GD) করুন।বাংলাদেশ পুলিশের সাইবার ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন ডিভিশনের ফেসবুক পেজে বা হেল্পলাইনে (০১৭৬৯৬৯১৫২২) যোগাযোগ করে অভিযোগ জানান। সরকারের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (ICT) বিভাগের সাইবার হেল্পডেস্কের সাহায্য নিন।মনে রাখবেন, সচেতনতাই এই ডিজিটাল ডাকাতদের হাত থেকে বাঁচার একমাত্র উপায়। আপনার একটি সচেতন সিদ্ধান্ত আপনার অর্থ ও সম্মান দুই-ই রক্ষা করতে পারে। চটকদার বিজ্ঞাপনে প্রলুব্ধ না হয়ে সর্বদা বৈধ ও সরকারি নিবন্ধিত আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সেবা নিন। ভাল থাকুন সকলে।
সম্পাদক ও প্রকাশক: এ বি এম মনিরুজ্জামান
নির্বাহী সম্পাদক: রিপন রুদ্র
যুগ্ম সম্পাদক: জাকিয়া সুলতানা (লাভলী)
কপিরাইট © ২০২৬ দৈনিক সংবাদ দিগন্ত । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত