প্রিন্ট এর তারিখ : ২৫ জুন ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ২৪ জুন ২০২৬
জলাবদ্ধতামুক্ত চট্টগ্রাম গড়তে খাল পুনরুদ্ধারে দখলদারদের স্বেচ্ছায় সরে যাওয়ার আহ্বান মেয়রের
এম মিজানুর রহমান, ব্যুরো প্রধান চট্টগ্রাম ||
র্ঘদিনের জলাবদ্ধতা, খাল দখল, নাব্যতা সংকট এবং পরিবেশগত অবক্ষয়ের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় চট্টগ্রাম নগরীর খাল-ছড়া পুনরুদ্ধারে ব্যাপক কর্মযজ্ঞ শুরু করেছে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক)। নগরের প্রাকৃতিক পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থাকে সচল করতে একাধিক খাল ও ছড়ায় পুনঃখনন কার্যক্রমের উদ্বোধন করে খাল দখলকারীদের প্রতি কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন চসিক মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন।বুধবার (২৪ জুন) সকালে নগরের দক্ষিণ পাহাড়তলী এলাকার ১ নম্বর ওয়ার্ডে অবস্থিত ঢুলুনিয়া ঢালা ছড়া, খাগড়িয়া ছড়া এবং খোশাল শাহ ছড়ার পুনঃখনন কার্যক্রম উদ্বোধন ও সরেজমিন পরিদর্শনকালে মেয়র বলেন, নগরবাসীর দুর্ভোগ লাঘব এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি পরিবেশবান্ধব ও টেকসই নগর গড়ে তুলতে খাল-ছড়া রক্ষার বিকল্প নেই। তিনি বলেন, “খাল ও ছড়াগুলো কেবল পানি প্রবাহের মাধ্যম নয়, এগুলো নগরের পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। কিন্তু বছরের পর বছর অবৈধ দখল, ময়লা-আবর্জনা ফেলা এবং অপরিকল্পিত স্থাপনা নির্মাণের কারণে এসব জলাধারের স্বাভাবিক প্রবাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। ফলে সামান্য বৃষ্টিতেই নগরবাসীকে জলাবদ্ধতার ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।”মেয়র জানান, নগরের বিভিন্ন খাল ও ছড়ার ওপর অবৈধভাবে স্থাপিত স্থাপনা, স্ল্যাব, দেয়াল ও অন্যান্য প্রতিবন্ধকতা চিহ্নিত করা হচ্ছে। যারা এসব দখল ও অবৈধ নির্মাণের সঙ্গে জড়িত, তাদের প্রতি স্বেচ্ছায় স্থাপনা অপসারণের আহ্বান জানানো হয়েছে। অন্যথায় সংশ্লিষ্ট আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।তিনি আরও বলেন, “আমরা কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে নয়, নগরের স্বার্থে কাজ করছি। খাল-ছড়ার জায়গা জনগণের সম্পদ। এগুলো দখল করে রাখার কোনো সুযোগ নেই। নগরবাসীর বৃহত্তর স্বার্থে সবাইকে সহযোগিতার মনোভাব নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে।”আরও পড়ুন, লামায় শিক্ষা-স্বাস্থ্য-উন্নয়নে নিরলস কাজ, প্রশংসায় ভাসছেন ইউএনও মো. মঈনউদ্দিনচসিক সূত্রে জানা যায়, নগরের বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতার কারণ এক নয়। কোথাও খালের নাব্যতা কমে গেছে, কোথাও দখলদারিত্বের কারণে পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, আবার কোথাও অপরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থার কারণে সংকট সৃষ্টি হচ্ছে। এ বাস্তবতায় ওয়ার্ডভিত্তিক সমস্যা চিহ্নিত করে সমাধান পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। মেয়র বলেন, “সমস্যার উৎস শনাক্ত না করে স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। তাই প্রতিটি এলাকার ভৌগোলিক ও অবকাঠামোগত বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে আমরা কাজ করছি। আমাদের লক্ষ্য সাময়িক নয়, দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নিশ্চিত করা।”চট্টগ্রাম নগরের পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থাকে আধুনিক ও কার্যকর করতে প্রায় ৪০টি খালকে অন্তর্ভুক্ত করে একটি বৃহৎ উন্নয়ন প্রকল্পের (ডিপিপি) প্রস্তাবনা প্রণয়নের কাজ চলছে বলে জানান মেয়র। তিনি বলেন, “খাগড়িয়া ছড়া, খোশাল শাহ ছড়াসহ গুরুত্বপূর্ণ জলাধারগুলোকে উন্নয়ন পরিকল্পনার আওতায় আনা হবে। খালের গভীরতা বৃদ্ধি, তীর সংরক্ষণে রিটেইনিং ওয়াল নির্মাণ, দখলমুক্তকরণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন এবং আধুনিক ওয়াকওয়ে নির্মাণের মতো উদ্যোগ বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে।”বিশেষজ্ঞদের মতে, নগরের প্রাকৃতিক জলাধারগুলো পুনরুদ্ধার করা গেলে শুধু জলাবদ্ধতা কমবে না, একই সঙ্গে পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং নগরবাসীর জীবনমান উন্নয়নেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।মেয়র তাঁর বক্তব্যে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজনন ক্ষেত্র হালদা নদী-এর প্রসঙ্গও তুলে ধরেন। তিনি বলেন, হালদা নদীর সঙ্গে সংযুক্ত খাল ও ছড়াগুলোর স্বাভাবিক প্রবাহ নিশ্চিত না করা গেলে নদী রক্ষা কার্যক্রমও পূর্ণাঙ্গভাবে সফল হবে না।আরও পড়ুন, কালুখালীতে ‘পার্টনার কংগ্রেস’ সেমিনার ও ফল মেলা অনুষ্ঠিততার ভাষ্য অনুযায়ী, দীর্ঘদিন ধরে পলি জমা, দখল এবং অব্যবস্থাপনার কারণে অনেক খাল ও ছড়া কার্যত মৃতপ্রায় অবস্থায় পৌঁছেছে। এসব জলপথ পুনরুদ্ধার করা গেলে বৃষ্টির পানি দ্রুত নিষ্কাশনের পাশাপাশি নদীর স্বাভাবিক প্রবাহও বজায় থাকবে।চলমান পুনঃখনন ও সংস্কার কার্যক্রমের গুণগত মান নিশ্চিত করতে স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন মেয়র। তিনি বলেন, উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের পাশাপাশি কাজের মান তদারকি এবং জলাধার রক্ষায় নাগরিকদের দায়িত্বশীল ভূমিকা প্রয়োজন।তিনি নগরবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, “খাল-ছড়াকে ময়লার ভাগাড়ে পরিণত না করে এগুলোকে রক্ষা করতে হবে। উন্নয়ন কাজ শেষ হওয়ার পরও নাগরিক সচেতনতা না বাড়লে কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া যাবে না।”পুনঃখনন কার্যক্রমের উদ্বোধন ও পরিদর্শনকালে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের প্রধান পরিচ্ছন্ন কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন ইখতিয়ার উদ্দিন আহমেদ চৌধুরী, সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কর্মকর্তারা, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ এবং এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।নগরবাসীর দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা অনুযায়ী খাল-ছড়া পুনরুদ্ধার কার্যক্রম কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয় এবং দখলমুক্তকরণে প্রশাসন কতটা সফল হয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়। তবে চসিকের এই উদ্যোগকে জলাবদ্ধতামুক্ত ও পরিবেশবান্ধব চট্টগ্রাম গঠনের পথে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
সম্পাদক ও প্রকাশক: এ বি এম মনিরুজ্জামান
নির্বাহী সম্পাদক: রিপন রুদ্র
যুগ্ম সম্পাদক: জাকিয়া সুলতানা (লাভলী)
কপিরাইট © ২০২৬ দৈনিক সংবাদ দিগন্ত । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত