প্রিন্ট এর তারিখ : ২১ জুন ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ২০ জুন ২০২৬
আল-আমিনের শাহজাদপুর-মেরুলে হোটেল ব্যবসার আড়ালে কী চলছে?
সংবাদ দিগন্ত: ||
রাজধানীর বাড্ডা এলাকায় সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ব্যাঙের ছাতার মতো গড়ে উঠেছে অসংখ্য আবাসিক হোটেল| স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব হোটেলের একটি অংশে ˆবধ আবাসন সেবার আড়ালে চলছে নানা ধরনের অনৈতিক ও অবৈধ কর্মকাণ্ড| বিশেষ করে বাড্ডা থানার মেরুল, শাহজাদপুর ও আশপাশের এলাকায় গড়ে ওঠা কয়েকটি আবাসিক হোটালকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে নানা অভিযোগ থাকলেও কার্যকর নজরদারি ও তদারকির অভাব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে|আরও পড়ুন: গুলশানে স্পা নেটওয়ার্কের নেপথ্যে কে এই নুর-ইসলাম?স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বাড্ডা থানাধীন মেরুল এলাকায় অবস্থিত হোটেল অরণ্য এবং শাহজাদপুর এলাকার সাউথ বাংলা হোটেল, গোল্ডেন ইনসহ আরও কয়েকটি আবাসিক হোটেলের বিরুদ্ধে নিয়মিতভাবে অনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার অভিযোগ রয়েছে| অভিযোগকারীদের দাবি, বাইরে থেকে সাধারণ আবাসিক হোটেল মনে হলেও ভেতরে ঘণ্টাভিত্তিক কক্ষ ভাড়া দিয়ে বিভিন্ন অসামাজিক কার্যকলাপ পরিচালিত হচ্ছে|এলাকাবাসীর ভাষ্য অনুযায়ী, দিনের তুলনায় সন্ধ্যার পর এসব হোটেলে মানুষের আনাগোনা কয়েকগুণ বেড়ে যায়| অনেক ক্ষেত্রে অল্প সময়ের জন্য কক্ষ ভাড়া নেওয়া হয় এবং পরিচয় যাচাই ছাড়াই অতিথিদের প্রবেশ করতে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে|আরও পড়ুন: উত্তরায় পুলিশের নাকের ডগায় গ্রান্ড প্লাজায় সোহেলের অসামাজিক কার্যক্রমএকজন স্থানীয় ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আমরা দীর্ঘদিন ধরে দেখছি, কিছু হোটেলে রাতের বেলা সন্দেহজনক লোকজনের যাতায়াত বেড়ে যায়| অনেক সময় ¯^ামী-স্ত্রী পরিচয়ে তরুণ-তরুণীরা প্রবেশ করে আবার অল্প সময়ের মধ্যে বের হয়ে যায়| বিষয়টি স্থানীয়দের মধ্যে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে| যে ধরনের কার্যক্রম হওয়ার কথা একটি আবাসিক হোটেলে, বাস্তবে তার চেয়ে ভিন্ন কিছু ঘটছে বলে আশপাশের মানুষ মনে করেন| প্রশাসনের নিয়মিত তদারকি থাকলে প্রকৃত অবস্থা বেরিয়ে আসবে|অভিযোগ রয়েছে, কিছু হোটেলকে কেন্দ্র করে একটি দালাল চক্র সক্রিয় রয়েছে| এই চক্র সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, মোবাইল ফোন ও বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে গ্রাহক সংগ্রহ করে থাকে| পরে নির্দিষ্ট হোটেলে নিয়ে গিয়ে কক্ষ বরাদ্দের ব্যবস্থা করা হয়| এই দালালদের মাধ্যমে অনেক সময় বাইরের এলাকা থেকে আগত ব্যক্তিদের সঙ্গে বিভিন্ন নারীর যোগাযোগ করিয়ে দেওয়া হয়| ফলে আবাসিক হোটেলগুলো ধীরে ধীরে অসামাজিক কর্মকাণ্ডের নিরাপদ আশ্রয়স্থলে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা ˆতরি হয়েছে|আরও পড়ুন: নদীতে নৌকায় বসে থাকা অবস্থায় বজ্রাঘাতহোটেল ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত বিধিমালা অনুযায়ী, কোনো অতিথিকে কক্ষ দেওয়ার আগে জাতীয় পরিচয়পত্র বা ˆবধ পরিচয়পত্র যাচাই করা এবং প্রয়োজনীয় তথ্য সংরক্ষণ বাধ্যতামূলক| কিন্তু কয়েকটি হোটেলের বিরুদ্ধে এই নিয়ম যথাযথভাবে অনুসরণ না করার অভিযোগ রয়েছে| অনেক ক্ষেত্রে ভুয়া পরিচয়ে কিংবা স্বামী-স্ত্রী পরিচয় দিয়ে কক্ষ ভাড়া নেওয়া হয়| এমনকি অতিথিদের প্রকৃত পরিচয় যাচাই ছাড়াই রুম বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে বলেও অভিযোগ উঠেছে| এতে করে আবাসিক হোটেলগুলো কেন্দ্র করে যেকোন মুহুর্তে ঘটতে পারে বড় কোন দুর্ঘটনা এবং মব সৃষ্টির আসংখ্যাও রয়েছে| নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, পরিচয় যাচাই ছাড়া কক্ষ ভাড়া দেওয়া শুধু অনৈতিক কর্মকাণ্ডই নয়, বরং বিভিন্ন ধরনের অপরাধ সংঘটনের ঝুঁকিও বাড়িয়ে দেয়| মাদক লেনদেন, প্রতারণা, ব্ল্যাকমেইল কিংবা অন্যান্য অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড সংঘটনের ক্ষেত্রেও এসব হোটেল ব্যবহার হতে পারে| ঘণ্টাভিত্তিক কক্ষ ভাড়া ও কথিত এসকর্ট সার্ভিসের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট একটি চক্র বিপুল পরিমাণ অর্থ উপার্জন করছে| প্রতিদিন অসংখ্য গ্রাহকের যাতায়াতের ফলে কয়েকটি প্রতিষ্ঠান রাতারাতি আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছে বলে স্থানীয়দের ধারণা|একজন সমাজকর্মী বলেন, যদি এসব অভিযোগ সত্য হয়, তাহলে এটি শুধু একটি সামাজিক সমস্যা নয়; বরং আইনশৃঙ্খলা ও ˆনতিকতার জন্যও বড় ধরনের হুমকি| দ্রুত তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত চিত্র সামনে আনা প্রয়োজন|আরও পড়ুন: সুন্দরগঞ্জের বাজারে ভয়াবহ আগুন, নিঃস্ব ব্যবসায়ীরাসামাজিক বিশ্লেষকদের মতে, আবাসিক হোটেলের আড়ালে অনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হলে তার নেতিবাচক প্রভাব পড়ে তরুণ সমাজের ওপর| সহজে অর্থ উপার্জনের লোভ, সামাজিক অবক্ষয় এবং অপরাধ প্রবণতা বৃদ্ধির পেছনে এসব কর্মকাণ্ড ভূমিকা রাখতে পারে| তাদের মতে, নগর জীবনের ব্যস্ততা ও গোপনীয়তার সুযোগকে কাজে লাগিয়ে একটি চক্র যদি অবৈধ কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে, তাহলে তা বন্ধে সম্নিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন| দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ থাকলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃশ্যমান পদক্ষেপ খুব একটা দেখা যায়নি| নিয়মিত অভিযান, লাইসেন্স যাচাই এবং অতিথি নিবন্ধন খাতা পর্যালোচনার মাধ্যমে প্রকৃত অবস্থা উদঘাটন সম্ভব বলে মনে করছেন তারা|এলাকাবাসীর প্রশ্ন, যদি সবকিছু নিয়ম মেনেই পরিচালিত হয়ে থাকে, তাহলে পরিচয় যাচাই ও নথিপত্র সংরক্ষণের বিষয়গুলো আরও কঠোরভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে না কেন? তাদের মতে, নিয়মিত মনিটরিং থাকলে কোনো প্রতিষ্ঠানই আইন বহির্ভূত কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে পারবে না|অভিযোগের বিষয়ে হোটেল ব্যবসার সঙ্গে জড়িত বলে উল্লেখ করা আল-আমিনের বক্তব্য জানার জন্য একাধিকবার মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়| তবে প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তার সঙ্গে যোগাযোগ সম্ভব হয়নি| ফলে তার বা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে উত্থাপিত অভিযোগের বিষয়ে কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি| ভবিষ্যতে তাদের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশ করা হবে|আরও পড়ুন: টঙ্গী পশ্চিম থানার বিশেষ অভিযানে জালনোট চক্রের সদস্যসহ গ্রেফতার ১৩আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কোনো আবাসিক হোটেল যদি লাইসেন্সের শর্ত ভঙ্গ করে পরিচালিত হয় অথবা অবৈধ কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকে, তাহলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে| তাদের মতে, নিয়মিত তদারকি, সিসিটিভি পর্যবেক্ষণ, অতিথি নিবন্ধন যাচাই এবং গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হলে অনেক অনিয়ম প্রতিরোধ করা সম্ভব| স্থানীয় বাসিন্দারা সংশ্লিষ্ট প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং সিটি করপোরেশনের প্রতি দ্রুত তদন্তের দাবি জানিয়েছেন| তারা বলছেন, অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ অনুসন্ধান করে প্রকৃত সত্য উদঘাটন করা প্রয়োজন| একই সঙ্গে অনুমোদনবিহীন আবাসিক হোটেল চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ এবং নিয়মিত মনিটরিং নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন তারা|আরও পড়ুন: কালিয়াকৈর চন্দ্রা মহাসড়কে হোটেলের আড়ালে নারী সিন্ডিকেটরাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ আবাসিক ও বাণিজ্যিক এলাকা বাড্ডায় আবাসিক হোটেলকে ঘিরে ওঠা এসব অভিযোগ নতুন নয়| তবে অভিযোগের সত্যতা যাচাই এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের| অন্যদিকে অভিযোগের মুখে থাকা প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিদের বক্তব্যও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ| অভিযোগ, পাল্টা অভিযোগ এবং স্থানীয়দের উদ্বেগের মধ্যেই প্রশ্ন রয়ে গেছে বাড্ডার কিছু আবাসিক হোটেল কি শুধুই আবাসন সেবা দিচ্ছে, নাকি এর আড়ালে চলছে আরও কিছু? সেই উত্তর খুঁজতে প্রয়োজন নিরপেক্ষ তদন্ত, কঠোর নজরদারি এবং আইনের যথাযথ প্রয়োগ|
সম্পাদক ও প্রকাশক: এ বি এম মনিরুজ্জামান
নির্বাহী সম্পাদক: রিপন রুদ্র
যুগ্ম সম্পাদক: জাকিয়া সুলতানা (লাভলী)
কপিরাইট © ২০২৬ দৈনিক সংবাদ দিগন্ত । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত