প্রিন্ট এর তারিখ : ১৫ জুন ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ১৫ জুন ২০২৬
আলোচনা, সমালোচনা আর দায়িত্বের গল্প: ওসি দাউদ
রিপন রুদ্র: ||
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর গুলশান থানা| রাজধানীর অভিজাত এলাকা গুলশান শুধু একটি থানা এলাকা নয়, এটি দেশের অর্থনীতি, কূটনীতি, আন্তর্জাতিক যোগাযোগ এবং উচ্চপর্যায়ের ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডের অন্যতম কেন্দ্র| ফলে এই থানার দায়িত্বে কে আসছেন, তা সবসময়ই বিশেষ গুরুত্ব বহন করে| আর সেই গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব এবার কাঁধে তুলে নিয়েছেন যশোরের সন্তান, অপরাধ দমনে আলোচিত পুলিশ কর্মকর্তা মো. দাউদ হোসেন|অরও পড়ুন: ডিএমপির কয়েকটি থানায় দৃশ্যমান পরিবর্তনপুলিশের বিভিন্ন সূত্র বলছে, মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা, দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা এবং আইন প্রয়োগে দৃঢ় অবস্থানের কারণেই গুলশানের মতো গুরুত্বপূর্ণ থানার দায়িত্ব তার হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে| মো. দাউদ হোসেনের কর্মজীবনের শুরু থেকেই দায়িত্বশীল ও পেশাদার কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিতি রয়েছে| দীর্ঘ চাকরি জীবনে তিনি বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ইউনিট ও থানায় দায়িত্ব পালন করে নিজের যোগ্যতার প্রমাণ দিয়েছেন| তবে রাজধানীর খিলগাঁও থানা এবং পরবর্তীতে ক্যান্টনমেন্ট থানায় দায়িত্ব পালনকালে তিনি সবচেয়ে বেশি আলোচনায় আসেন|সহকর্মীদের মতে, তিনি এমন একজন কর্মকর্তা যিনি অফিসকেন্দ্রিক পুলিশিংয়ের চেয়ে মাঠপর্যায়ে কাজ করতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন| অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর শুধু তদন্ত নয়, অপরাধ প্রতিরোধেও তিনি গুরুত্ব দেন|অরও পড়ুন: প্রশংসা-সমালোচনার কেন্দ্রে থাকা ওসি দাউদখিলগাঁও থানায় দায়িত্ব পালনকালে মাদক, চুরি, ছিনতাই, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড এবং সংঘবদ্ধ অপরাধ চক্রের বিরুদ্ধে একাধিক সফল অভিযান পরিচালনা করেন| তার নেতৃত্বে পরিচালিত অভিযানে বেশ কয়েকটি অপরাধী নেটওয়ার্ক ভেঙে দেওয়া হয়| একই সঙ্গে বিট পুলিশিং ও জনবান্ধব পুলিশিং কার্যক্রমকে আরও গতিশীল করার উদ্যোগ নেন তিনি|খিলগাঁও থেকে ক্যান্টনমেন্ট থানায় দায়িত্ব গ্রহণের পরও অপরাধ নিয়ন্ত্রণে একই ধরনের সক্রিয়তা বজায় রাখেন তিনি| বিশেষ করে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর দেশের বিভিন্ন এলাকায় যখন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে, তখন ক্যান্টনমেন্ট থানার দায়িত্বে থেকে তিনি বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ মামলার তদন্ত ও অভিযান পরিচালনা করেন| চব্বিশের ৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে দায়ের হওয়া ˆবষম্যবিরোধী আন্দোলনের বিভিন্ন মামলায় সাবেক সংসদ সদস্যসহ আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ এবং তাদের গ্রেপ্তারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন তিনি|অরও পড়ুন: অপরাধ দমনে নতুন ছকে ডিএমপিপুলিশ সূত্র বলছে, এসব মামলার তদন্ত ও অভিযান পরিচালনার সময় ব্যাপক চাপ ও নানা ধরনের সমালোচনার মুখোমুখি হতে হলেও তিনি আইনি প্রক্রিয়ার বাইরে যাননি| বরং তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনা করেন| তার কর্মকাণ্ডের কারণে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ব্যাপক আলোচনা ˆতরি হয়| আওয়ামী লীগের নিষিদ্ধ ঘোষিত বিভিন্ন প্ল্যাটফর্ম ও সমর্থক গোষ্ঠীর পক্ষ থেকে তাকে নিয়ে একাধিক নেতিবাচক প্রচারণা চালানো হয়| এমনকি আওয়ামী লীগের অফিসিয়াল ফেসবুক পেইজেও তাকে নিয়ে বিভিন্ন সময়ে সমালোচনামূলক পোস্ট দেওয়া হয়েছে বলে জানা যায়| তবে এসব বিষয়কে গুরুত্ব না দিয়ে নিজের দায়িত্ব পালনেই মনোযোগী ছিলেন তিনি| তার ঘনিষ্ঠরা বলছেন, সমালোচনা কিংবা চাপ নয়, বরং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠাই ছিল তার মূল লক্ষ্য|একজন জ্যেষ্ঠ পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, দাউদ হোসেন দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে কখনো ব্যক্তিগত বা রাজনৈতিক বিবেচনাকে প্রাধান্য দেন না| আইন যেদিকে নির্দেশ করে, তিনি সেদিকেই কাজ করার চেষ্টা করেন| ক্যান্টনমেন্ট থানায় দায়িত্ব পালনকালে মাদকবিরোধী অভিযান, চুরি-ডাকাতি প্রতিরোধ, সংঘবদ্ধ অপরাধ চক্র শনাক্তকরণ এবং ওয়ারেন্টভুক্ত আসামি গ্রেপ্তারে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেন তিনি|পুলিশের অভ্যন্তরীণ সূত্র বলছে, তার নেতৃত্বে পরিচালিত অভিযানে বিভিন্ন অপরাধী চক্রের সদস্যদের গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়েছে| ফলে ক্যান্টনমেন্ট এলাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন তিনি| শুধু অপরাধ দমন নয়, জনগণের সঙ্গে পুলিশের সম্পর্ক উন্নয়নেও তিনি কাজ করেছেন| স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে নিয়মিত মতবিনিময়, সচেতনতামূলক সভা এবং বিট পুলিশিং কার্যক্রম জোরদারের মাধ্যমে জনমুখী পুলিশিং নিশ্চিত করার চেষ্টা করেন|অরও পড়ুন: মধ্যরাতে অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে, পরে হেলিকপ্টারে ঢাকায় ডিসিরাজধানীর গুলশান এলাকা দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক ও কূটনৈতিক জোন| এখানে রয়েছে বিভিন্ন দেশের দূতাবাস, আন্তর্জাতিক সংস্থা, বহুজাতিক কোম্পানি, পাঁচতারকা হোটেল এবং দেশের শীর্ষ ব্যবসায়ীদের আবাসস্থল| ফলে গুলশান থানার দায়িত্ব শুধু সাধারণ আইনশৃঙ্খলা রক্ষা নয়, বরং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার সঙ্গেও সংশ্লিষ্ট|সাম্প্রতিক সময়ে এই এলাকায় সাইবার অপরাধ, আর্থিক প্রতারণা, মাদক ব্যবসা, সংঘবদ্ধ অপরাধ এবং বিভিন্ন অবৈধ কর্মকাণ্ড নিয়ে আলোচনা রয়েছে| এছাড়া অভিজাত এলাকার আড়ালে সংঘটিত কিছু অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে|অরও পড়ুন: মিরপুরে আলোচিত ওসি হাফিজুর রহমানএই বাস্তবতায় একজন অভিজ্ঞ, দৃঢ়চেতা এবং মাঠপর্যায়ে সক্রিয় কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা ছিল বলে মনে করছেন নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা| গণমাধ্যমকর্মীদের কাছেও মো. দাউদ হোসেন পরিচিত একটি নাম| বিভিন্ন অভিযানের বিষয়ে তথ্যভিত্তিক বক্তব্য প্রদান এবং সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে সমš^য় করে কাজ করার কারণে সাংবাদিক মহলেও তার একটি ইতিবাচক ভাবমূর্তি রয়েছে|একাধিক অপরাধবিষয়ক প্রতিবেদক জানান, তিনি তথ্য গোপন না করে আইনি সীমার মধ্যে থেকে প্রয়োজনীয় তথ্য সরবরাহের চেষ্টা করেন| ফলে সংবাদ সংগ্রহের ক্ষেত্রেও সহযোগিতামূলক মনোভাব দেখা যায় তার মধ্যে| আইনশৃঙ্খলা বিশেষজ্ঞদের মতে, গুলশান থানার দায়িত্ব পাওয়া যেমন সম্মানের, তেমনি এটি একটি বড় চ্যালেঞ্জও| কারণ রাজধানীর সবচেয়ে সংবেদনশীল ও আলোচিত এলাকাগুলোর একটি হলো গুলশান| এখানে অপরাধ নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি কূটনৈতিক নিরাপত্তা, বিদেশি নাগরিকদের সুরক্ষা, করপোরেট নিরাপত্তা এবং প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধ মোকাবিলা সমান গুরুত্বপূর্ণ|অরও পড়ুন: পুলিশ হত্যা, সংস্কার ও জননিরাপত্তা: সংকট উত্তরণের পথ কোথায়?বিশেষজ্ঞদের মতে, অতীত অভিজ্ঞতা এবং মাঠপর্যায়ের দক্ষতা কাজে লাগিয়ে তিনি গুলশান থানার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে আরও শক্তিশালী করতে সক্ষম হবেন| ডিএমপির অভ্যন্তরীণ সূত্রগুলো বলছে, নিষ্ঠা, সাহসিকতা, পেশাদারিত্ব এবং দায়িত্ব পালনে দৃঢ়তার কারণেই তাকে এই গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে|গুলশান থানায় যোগদানের পর তার সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে অপরাধ নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি জনগণের আস্থা আরও বৃদ্ধি করা| বিশেষ করে আধুনিক নগর অপরাধ, সাইবার জালিয়াতি, মাদক কারবার এবং সংঘবদ্ধ অপরাধ চক্রের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়টি গুরুত্ব পাবে| সব মিলিয়ে ক্যান্টনমেন্ট থেকে গুলশান এই যাত্রা শুধুমাত্র একজন পুলিশ কর্মকর্তার পদায়ন নয়, বরং এটি তার কর্মদক্ষতা ও পেশাদার নেতৃত্বের প্রতি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের আস্থার প্রতিফলন বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা| এখন রাজধানীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই থানার দায়িত্বে থেকে তিনি কতটা সফলভাবে নতুন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে পারেন, সেদিকেই নজর থাকবে নগরবাসী, আইনশৃঙ্খলা বিশ্লেষক এবং সংশ্লিষ্ট মহলের|
সম্পাদক ও প্রকাশক: এ বি এম মনিরুজ্জামান
নির্বাহী সম্পাদক: রিপন রুদ্র
যুগ্ম সম্পাদক: জাকিয়া সুলতানা (লাভলী)
কপিরাইট © ২০২৬ দৈনিক সংবাদ দিগন্ত । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত