প্রিন্ট এর তারিখ : ১৪ জুলাই ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ১১ মে ২০২৬
লামায় স্বাস্থ্যসেবার নামে প্রতারণা, নেই প্রশাসনিক অভিযান
ইনতিয়াজ হোসেন (বান্দরবান): ||
বান্দরবানের লামা উপজেলায় স্বাস্থ্যসেবার আড়ালে কি চলছে ভয়ংকর প্রতারণা? একের পর এক ভুল রিপোর্ট, অদক্ষ জনবল, পুরনো মেশিনে পরীক্ষা, রোগীদের আতঙ্কিত করে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠলেও রহস্যজনকভাবে নীরব প্রশাসন| ধারাবাহিক সংবাদ প্রকাশের পরও এখনো পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো অভিযান, তদন্ত কিংবা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না নেওয়ায় জনমনে ক্ষোভ বাড়ছে| অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে শান্তিনিকেতন ডক্টরস এন্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টার| স্থানীয়দের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে প্রতিষ্ঠানটি ভুল রিপোর্ট দিয়ে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করছে| অথচ অভিযোগের পাহাড় জমলেও সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্য বিভাগ ও প্রশাসনের রহস্যজনক নীরবতায় প্রশ্ন উঠেছে, তাহলে কি কোনো অদৃশ্য শক্তির ছত্রছায়ায় চলছে এসব অনিয়ম?আরও পড়ুন: লামায় শান্তিনিকেতনে ভুল রিপোর্টে আতঙ্ক, দায় এড়ালেন মালিকঘটনার সূত্রপাত সাদিয়া নামের এক রোগীকে ঘিরে| গত ২৯ মার্চ ২০২৬ তারিখে উক্ত ডায়াগনস্টিক সেন্টারে তার Lower Abdomen আল্ট্রাসনোগ্রাম করা হয়| রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়—তার শরীরে ৪.১০ × ২.৪৭ × ২.৪০ সেন্টিমিটার আকারের একটি ‘Complex Cyst’ রয়েছে| ওই রিপোর্ট দেখিয়ে রোগী পরিবারকে আতঙ্কিত করা হয় এবং প্রায় ১২ হাজার টাকার ওষুধ গ্রহণ করানো হয়| কিন্তু মাত্র পাঁচ দিন পর, কক্সবাজারের চকরিয়ায় অবস্থিত এ কে এস ডায়াগনস্টিক সেন্টার-এ পুনরায় পরীক্ষা করালে রিপোর্ট আসে Normal Studz| অর্থাৎ, আগের রিপোর্টে যে সিস্ট দেখানো হয়েছিল, তার কোনো অস্তিত্বই পাওয়া যায়নি| এ ঘটনায় রোগীর পরিবারে সৃষ্টি হয় তীব্র ক্ষোভ| স্থানীয়দের প্রশ্ন একটি Complex Cyst কি পাঁচ দিনে উধাও হয়ে যায়, নাকি রোগীদের ভয় দেখিয়ে চিকিৎসার নামে চলছে ব্যবসা?আরও পড়ুন: মিরপুরে আলোচিত ওসি হাফিজুর রহমানভুক্তভোগী পরিবার বলছে, ভুল রিপোর্টের কারণে তারা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন| অপ্রয়োজনীয় চিকিৎসা, ওষুধ এবং পরীক্ষা-নিরীক্ষার পেছনে গুনতে হয়েছে মোটা অঙ্কের টাকা| একটি রিপোর্ট পুরো পরিবারকে আতঙ্কে ফেলে দেয়| আমরা ভাবছিলাম বড় ধরনের রোগ হয়েছে| পরে অন্য জায়গায় পরীক্ষা করে দেখি সব স্বাভাবিক| তাহলে আমাদের সাথে এটা কী হলো?স্থানীয়দের অভিযোগ, এমন ঘটনা একদিনের নয়| প্রায় ৩০ থেকে ৪০টি ভুল রিপোর্টের অভিযোগ রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে| কেউ ভুল রোগ নির্ণয়ের শিকার হয়েছেন, কেউ আবার অপ্রয়োজনীয় ওষুধ খেয়ে শারীরিক জটিলতায় পড়েছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে|আরও পড়ুন: রাজধানীতে আক্তারের আবাসিক হোটেল সিন্ডিকেট বিস্তারঅনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে আরও ভয়ংকর তথ্য| অভিযোগ রয়েছে, প্রতিষ্ঠানটিতে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত টেকনোলজিস্ট ও নার্সের ঘাটতি রয়েছে| এমনকি কলেজপড়ুয়া শিক্ষার্থীদের দিয়েও এক্স রে ও রিপোর্ট ˆতরির কাজ করানো হয়| এখানে দ্রুত রিপোর্ট দেওয়ার প্রতিযোগিতা চলে| রোগী বেশি, কিন্তু দক্ষ লোক কম| ফলে অনেক সময় সঠিকভাবে পরীক্ষা ছাড়াই রিপোর্ট দেওয়া হয়|এছাড়া যিনি আল্ট্রাসনোগ্রাফি পরিচালনা করছেন, তার স্বীকৃত প্রশিক্ষণ ও অভিজ্ঞতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে| ব্যবহৃত কয়েকটি মেশিন পুরনো এবং অনেকগুলোর ˆবধ কাগজপত্র নেই বলেও অভিযোগ রয়েছে|অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে প্রতিষ্ঠানটির মালিক বিকাশ কলি সেন বলেন, ডাক্তাররা যদি ভুল রিপোর্ট দেন তাহলে আমার করণীয় কী? এসব ভুলের দায় ডাক্তারদের নিতে হবে| আমি দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসা করে আসছি| তবে স্থানীয়দের প্রশ্ন, এছাড়াও বিকাশ কলি সেনের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, তিনি স্বৈরাচারী আ.লীগের সময় ও বেশ দাপটের সাথে চালিয়ে আসছিলেন তার ব্যবসা| কিন্তু তার অপরাধের তথ্য কেউ তুলে ধরতে সাহস পায়নি|আরও পড়ুন: হঠাৎ বৃষ্টিতে রাজধানী ডুবল পানিতে , ভোগান্তিতে নগরবাসীকিন্তু সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন উঠেছে প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে| ধারাবাহিক সংবাদ প্রকাশ, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সমালোচনার ঝড় এবং একাধিক ভুক্তভোগীর অভিযোগ সামনে এলেও এখনো পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নেয়নি চট্টগ্রাম বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর| অন্যদিকে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হলেও বাস্তবে কোনো অভিযান বা তদন্তের খবর পাওয়া যায়নি| অথচ সংবাদ প্রকাশ হলো, অভিযোগ উঠলো, মানুষ প্রতিবাদ করলো কিন্তু প্রশাসনের কোনো নড়াচড়া নেই| তাহলে কি সাধারণ মানুষের জীবনের কোনো মূল্য নেই? তবে কি রাজনৈতিক প্রভাব ও অদৃশ্য শক্তির কারণে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে সাহস পাচ্ছে না সংশ্লিষ্টরা|একজন স্থানীয় সমাজকর্মী বলেন, যদি অভিযোগ মিথ্যা হয় তাহলে তদন্ত করে ক্লিনিককে ক্লিন সার্টিফিকেট দেওয়া হোক| আর যদি সত্য হয় তাহলে বন্ধ করা হোক| কিন্তু প্রশাসনের এই নীরবতা মানুষের সন্দেহ আরও বাড়াচ্ছে| আরও পড়ুন: মাদক-চাঁদাবাজের গডফাদারদের তালিকা প্রভাবশালীদের দিকেই যাচ্ছে : এডিসি জুয়েলস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একটি ভুল রিপোর্ট মানে শুধু একটি ভুল তথ্য নয় এটি একজন রোগীর জীবনের ঝুঁকি| ভুল রিপোর্টের কারণে কেউ অপ্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিতে পারেন, আবার প্রকৃত রোগ থাকলেও তা ধরা না পড়তে পারে| এরকম একাধিক ভূল রিপোর্ট বাণিজ্য চালিয়ে আসছে উক্ত প্রতিষ্ঠানের বিকাশ কলি সেন| তাদের মতে, প্রান্তিক এলাকায় গড়ে ওঠা অনেক ডায়াগনস্টিক সেন্টার যথাযথ অনুমোদন, দক্ষ জনবল ও প্রযুক্তিগত মান ছাড়াই পরিচালিত হচ্ছে| ফলে সাধারণ মানুষ প্রতিনিয়ত ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন| ¯^াস্থ্যসেবা কোনো ব্যবসার খেলনা নয়| এখানে মানুষের জীবন জড়িত| ভুল রিপোর্ট দিয়ে মানুষের জীবন নিয়ে খেলা বন্ধ করতে হবে| এখন দেখার বিষয় অভিযোগ, ক্ষোভ এবং ধারাবাহিক সংবাদ প্রকাশের পরও প্রশাসন কতদিন নীরব থাকে| নাকি শেষ পর্যন্ত তদন্তের মুখোমুখি হবে অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠানটি| আরও পড়ুন: রাজধানীজুড়ে খোঁড়াখুঁড়ির , দুর্ভোগ উন্নয়নের নামে জনভোগান্তি চরমে
সম্পাদক ও প্রকাশক: এ বি এম মনিরুজ্জামান
নির্বাহী সম্পাদক: রিপন রুদ্র
যুগ্ম সম্পাদক: জাকিয়া সুলতানা (লাভলী)
কপিরাইট © ২০২৬ দৈনিক সংবাদ দিগন্ত । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত