প্রিন্ট এর তারিখ : ২৫ এপ্রিল ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ২৪ এপ্রিল ২০২৬
পুলিশের দায়িত্ব পালনে বাধা মব কালচার
রিপন রুদ্র: ||
দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি একটি রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতার অন্যতম প্রধান সূচক| আর এই সূচককে সচল রাখতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা পুলিশ| সাম্প্রতিক সময়ের নানা প্রতিকূলতা, সমালোচনা এবং বাস্তব সংকটের মধ্য দিয়ে যাওয়ার পর বাংলাদেশ পুলিশ আবারও ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে| তবে এই পথ মোটেও সহজ নয়; বরং এটি একটি দীর্ঘ, জটিল এবং বহুমাত্রিক প্রক্রিয়া|আরো পড়ুন: আইনের শাসন না মবের রাজত্ব?ইতিপূর্বে বিভিন্ন ঘটনা, বিতর্ক এবং চাপের কারণে পুলিশের মনোবলে বড় ধরনের প্রভাব পড়ে| বিশেষ করে একটি নির্দিষ্ট সময়ের পর (যেমন ৫ আগস্ট পরবর্তী পরিস্থিতি) পুলিশের মধ্যে একধরনের হতাশা, অনিশ্চয়তা এবং পেশাগত চাপ বৃদ্ধি পায়| অনেক সদস্য নিজেদের দায়িত্ব পালনে নিরুৎসাহিত বোধ করতে থাকেন| তবে সময়ের সাথে সাথে পরিস্থিতির পরিবর্তন হচ্ছে| প্রশাসনিক উদ্যোগ, নতুন দিকনির্দেশনা এবং অভ্যন্তরীণ পুনর্গঠনের মাধ্যমে পুলিশ বাহিনীর মধ্যে আবারও কর্মস্পৃহা ফিরে আসছে| মাঠপর্যায়ে তাদের কার্যক্রমে ধীরে ধীরে দৃঢ়তা লক্ষ্য করা যাচ্ছে, যা একটি ইতিবাচক ইঙ্গিত|পুলিশ সদস্যরা যখন আইন প্রয়োগ করতে মাঠে নামেন, তখন তাদের নানা ধরনের প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হতে হয়| বিশেষ করে কিছু ক্ষেত্রে স্থানীয় প্রভাবশালী গোষ্ঠী, রাজনৈতিক চাপ এবং জনতার ভুল প্রতিক্রিয়া তাদের কাজকে কঠিন করে তোলে| সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, মব বা গণজমায়েতের মাধ্যমে আইন প্রয়োগে বাধা সৃষ্টি করা| কোনো ঘটনা ঘটলে তাৎক্ষণিকভাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে এবং অনেক সময় যাচাই-বাছাই ছাড়াই জনতা উত্তেজিত হয়ে ওঠে| ফলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়|আরো পড়ুন: মাঠে মব, কোণঠাসা পুলিশ বাহিনীপুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে অভিযোগ যেমন রয়েছে, তেমনি তাদের নিজেরাও অনেক সময় হয়রানির শিকার হচ্ছেন এমন অভিযোগও কম নয়| মাঠপর্যায়ে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে তাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপপ্রচার, এমনকি সরাসরি হামলার ঘটনাও ঘটছে| এতে একদিকে যেমন তাদের মানসিক চাপ বাড়ছে, অন্যদিকে দায়িত্ব পালনের আগ্রহও কমে যাচ্ছে|আরো পড়ুন: মিঠাপুকুরে আলপনা ফিলিং স্টেশনে জার্কিনে তেল বিক্রি বন্ধ, পুলিশের হস্তক্ষেপে শৃঙ্খলা ফিরেছেবিশেষ করে ট্রাফিক পুলিশ বা সার্জেন্টদের ক্ষেত্রে এই সমস্যা বেশি দেখা যায়| তারা যখন সড়কে নিয়ম-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে যানবাহন থামান বা আইনগত ব্যবস্থা নিতে চান, তখন অনেক সময় উল্টো তাদেরই হয়রানির শিকার হতে হয়| এমনকি কিছু ক্ষেত্রে শারীরিক লাঞ্ছনার ঘটনাও ঘটছে, যা অত্যন্ত দুঃখজনক| এই ধরনের বাধা ও হয়রানি পুলিশের কার্যক্রমে সরাসরি প্রভাব ফেলছে| যখন একজন পুলিশ সদস্য তার দায়িত্ব পালনের সময় নিরাপত্তাহীনতা অনুভব করেন, তখন তার পক্ষে নিরপেক্ষ ও কার্যকর সিদ্ধান্ত নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে| ফলে অপরাধীরা সুযোগ পায় এবং অপরাধ প্রবণতা বাড়তে থাকে| বিশেষজ্ঞদের মতে, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার প্রতি যদি সামাজিকভাবে সম্মান ও সহযোগিতা না থাকে, তাহলে কোনোভাবেই টেকসই আইনশৃঙ্খলা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়| একজন ট্রাফিক সার্জেন্ট বলেন, আমরা যখন গাড়ি থামাই, তখন অনেকেই মনে করে আমরা হয়রানি করছি| কিন্তু আমরা তো আইনের প্রয়োগ করছি| এই জায়গাটাই মানুষ বুঝতে চায় না|আরো পড়ুন: কোন্দলের আগুনে পুড়ছে রাজনীতিবাংলাদেশ পুলিশের কাঠামোতে রয়েছে বিভিন্ন বিশেষায়িত ইউনিট, যারা নির্দিষ্ট দায়িত্ব পালন করে থাকে| এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য, (১) রেঞ্জ পুলিশ, (২). স্পেশাল ব্রাঞ্চ (এসবি) (৩). ক্রিমিনাল ইনভেস্টিগেশন ডিপার্টমেন্ট (সিআইডি), (৪). রেলওয়ে পুলিশ (জিআরপি) (৫). হাইওয়ে পুলিশ (৬). ইন্ডাস্ট্রিয়াল পুলিশ (৭). পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) (৮). স্পেশাল সিকিউরিটি অ্যান্ড প্রোটেকশন ব্যাটালিয়ন (এসপিবিএন) (৯). আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন), (১০). এয়ারপোর্ট আর্মড পুলিশ (এএপি), (১১). র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব), (১২). নৌ পুলিশ (১৩). ট্যুরিষ্ট পুলিশ (১৪). পর্যটন পুলিশ (১৫). কমিউনিটি পুলিশ এসব ইউনিট দেশের বিভিন্ন খাতে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে| তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে তাদের দক্ষতা আরও বাড়ানো, প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি এবং সমš^য় জোরদার করা অত্যন্ত জরুরি|আরো পড়ুন: কক্সবাজার খুরুশকুল নতুন ব্রীজে বাইকের ধাক্কায় এক জনের মৃত্যুএদিকে রাজধানীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে| ডিএমপির প্রতিটি স্তরের কর্মকর্তাদের বিশেষ করে ডিসি (উপ-পুলিশ কমিশনার) এবং ওসি (থানা ইনচার্জ) আরও শক্তিশালী ও কার্যকর করা প্রয়োজন| তাদেরকে স্থানীয় পরিস্থিতি অনুযায়ী দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা দিতে হবে এবং জনগণের সাথে সরাসরি যোগাযোগ বাড়াতে হবে| কমিউনিটি পুলিশিং কার্যক্রম জোরদার করা গেলে অপরাধ প্রতিরোধ অনেক সহজ হবে| পুলিশের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো জনআস্থা পুনরুদ্ধার করা| অতীতে কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা, অনিয়ম এবং দুর্নীতির অভিযোগের কারণে জনগণের একটি অংশ পুলিশের প্রতি আস্থা হারিয়েছিল| তবে বর্তমানে সেই পরিস্থিতি ধীরে ধীরে পরিবর্তন হচ্ছে| পুলিশের কিছু ইতিবাচক উদ্যোগ, মানবিক আচরণ এবং দ্রুত সেবা প্রদান জনমনে আস্থা ফিরিয়ে আনছে|আরো পড়ুন: পুলিশ হত্যা, সংস্কার ও জননিরাপত্তা: সংকট উত্তরণের পথ কোথায়? বিশেষজ্ঞদের মতে, জনআস্থা অর্জন করতে হলে পুলিশের আচরণ হতে হবে ¯^চ্ছ, জবাবদিহিমূলক এবং মানবিক| বর্তমানে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির জন্য সবচেয়ে বড় হুমকিগুলোর একটি হলো ‘মব জাস্টিস’ বা গণপিটুনি| এটি শুধু আইনবিরোধী নয়, বরং একটি সভ্য সমাজের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর| কোনো অপরাধ সংঘটিত হলে তার বিচার করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের| কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, জনতা নিজেরাই বিচার করতে এগিয়ে যায়, যা পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তোলে| এই প্রবণতা বন্ধ করতে হলে জনসচেতনতা বাড়াতে হবে এবং আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিতে হবে| এছাড়া পুলিশ সদস্যদের জন্য একটি নিরাপদ ও সম্মানজনক কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি|আরো পড়ুন: ব্যাংককের হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ডিএমপির ইন্সপেক্টর মো. আসাদুজ্জামানের মৃত্যুআইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব শুধু পুলিশের নয়; এটি একটি সম্মিলিত দায়িত্ব| জনগণ যদি সচেতন না হয় এবং আইন মেনে না চলে, তাহলে কোনোভাবেই একটি নিরাপদ সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব নয়| পুলিশকে সহযোগিতা করা, আইন মেনে চলা এবং অপরাধের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া—এসবই একজন দায়িত্বশীল নাগরিকের কর্তব্য| সব মিলিয়ে বলা যায়, বাংলাদেশ পুলিশ বর্তমানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে| নানা চ্যালেঞ্জ থাকা সত্ত্বেও তারা আবার ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে| এই প্রচেষ্টাকে সফল করতে হলে প্রয়োজন সমšি^ত উদ্যোগ—সরকার, প্রশাসন এবং জনগণের সম্মিলিত প্রচেষ্টা| আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হলে পুলিশ ও জনগণের মধ্যে আস্থার সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে| যদি এই সম্পর্ক শক্তিশালী করা যায়, তাহলে খুব শিগগিরই দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে এমনটাই আশা করা যায়|
সম্পাদক ও প্রকাশক: এ বি এম মনিরুজ্জামান
নির্বাহী সম্পাদক: রিপন রুদ্র
যুগ্ম সম্পাদক: জাকিয়া সুলতানা (লাভলী)
কপিরাইট © ২০২৬ দৈনিক সংবাদ দিগন্ত । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত