প্রিন্ট এর তারিখ : ১৫ জুন ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
হোটেল সিন্ডিকেটে জিম্মি শ্যামলী আদাবর
ডেস্ক ||
রাজধানীর ব্যস্ততম অঞ্চলগুলোর একটি শ্যামলী। এর পাশেই আদাবর ও শেরেবাংলা নগর যেখানে দিনের বেলায় স্বাভাবিক নাগরিক জীবনের চিত্র দেখা গেলেও রাত নামলেই ভিন্ন এক বাস্তবতা সামনে আসে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। আবাসিক হোটেলের আড়ালে গড়ে ওঠা একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট নিয়ে বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে দীর্ঘদিনের ক্ষোভ ও আতঙ্ক ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে। তবে রমজান মাস চলমান থাকলেও অনৈতিক কার্যক্রম থেমে নেই এমনটাই দাবি এলাকাবাসীর একাংশের। তাদের অভিযোগ, তেজগাঁও বিভাগের অন্তর্গত এসব এলাকায় অনুমোদনহীন বা নিয়মবহির্ভূত আবাসিক হোটেল গড়ে উঠেছে, যেগুলোর কিছুতে ঘণ্টাভিত্তিক কক্ষ ভাড়া দেওয়া হয় এবং সেখানে অসামাজিক কার্যকলাপ, মাদক লেনদেন ও নারী শোষণের অভিযোগ রয়েছে।শ্যামলীর মেইন রোড থেকে শুরু করে বিভিন্ন সড়কে চোখে পড়ে আধুনিক সাইনবোর্ড এর বিজ্ঞাপন। বাইরে থেকে সাধারণ আবাসিক হোটেল মনে হলেও স্থানীয়দের ভাষ্য, ভেতরে ভিন্ন চিত্র। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ে যাতায়াত। ব্যক্তিগত গাড়ি এসে থামে, কিছুক্ষণ পর আবার চলে যায়। একজন স্থানীয় দোকানদার নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, দিনে সব স্বাভাবিক মনে হয়। কিন্তু রাত ৯টার পর থেকেই অন্য রকম ভিড় দেখা যায়। অনেকেই জানে ভেতরে কী হচ্ছে, কিন্তু কেউ প্রকাশ্যে কিছু বলতে সাহস পায় না।স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, আদাবর থানাধীন একটি হোটেল ‘প্যারেড়’ এর মালিক হিসেবে পরিচিত মধু নামের একজন ব্যক্তি ও হোটেল হানিফ এবং শেরেবাংলা নগর থানাধীন ‘হোটেল একতা, শেরই-বাংলাসহ একাধিক হোটেলের সঙ্গে জড়িত ইসমাইল নামের এক ব্যক্তি নিয়ে নানা অভিযোগ রয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে এলাকায় প্রভাব বিস্তার এবং হোটেল কার্যক্রম পরিচালনা। তবে এ বিষয়ে তাদের বক্তব্য জানার জন্য একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও প্রতিবেদক কাউকে পাওয়া যায়নি। সংশ্লিষ্ট হোটেল কর্তৃপক্ষও আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো প্রতিক্রিয়া দেয়নি।মানবাধিকারকর্মীদের অভিযোগ, এসব স্থানে প্রতারণার মাধ্যমে তরুণীদের নিয়ে আসা হয়। কেউ চাকরির প্রলোভনে, কেউ বিদেশে পাঠানোর আশ্বাসে, আবার কেউ ঋণের ফাঁদে পড়ে আটকে যায়। পরবর্তীতে তাদের চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা হয়, পরিচয়পত্র বা মোবাইল ফোন জিম্মি রাখা হয় এমন অভিযোগও রয়েছে। এক মানবাধিকার সংগঠনের এক কর্মকর্তা বলেন, এই ধরনের হোটেলে অনেক সময় মানবপাচারের প্রাথমিক ধাপ সম্পন্ন হয়। মেয়েদের মানসিকভাবে ভেঙে ফেলা হয়, যাতে তারা বেরিয়ে যেতে না পারে। বিষয়টি গভীরভাবে তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। কিছু হোটেল কক্ষ মাদক ব্যবসায়ীদের ‘সেফ হাউস’ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। ইয়াবা, বিদেশি মদসহ বিভিন্ন মাদকদ্রব্য হাতবদলের অভিযোগ পাওয়া গেছে। দিনের বেলায় সাধারণ অতিথি সেজে প্রবেশ, রাতে চুক্তি এমন পদ্ধতির কথা জানিয়েছেন একাধিক সূত্র।আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, অভিযোগগুলো আমাদের নজরে আছে। তবে প্রমাণ সংগ্রহ ও আইনি প্রক্রিয়া জটিল। অনেক ক্ষেত্রে প্রভাবশালী ব্যক্তিরা জড়িত থাকায় তদন্ত দীর্ঘায়িত হয়। অভিযোগ রয়েছে, এসব হোটেলকে ঘিরে একটি সংঘবদ্ধ চক্র সক্রিয়। স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি, দালাল, অবৈধ ব্যবসা নিয়ন্ত্রক ও মাদক কারবারিরা একত্রে কাজ করছে। নতুন কেউ ব্যবসা শুরু করতে চাইলে অনুমতি নিতে হয় এমন অভিযোগও রয়েছে। এক প্রাক্তন হোটেল কর্মচারী দাবি করেন, মাসের নির্দিষ্ট সময়ে অর্থ লেনদেন হয়। কোনো অভিযান হলে আগে থেকেই খবর পেয়ে যায় সংশ্লিষ্টরা। কয়েক ঘণ্টা বন্ধ রেখে আবার আগের মতো শুরু হয়। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত এখনো দৃশ্যমান নয়। রাজধানীতে অবৈধ হোটেলবিরোধী অভিযান নিয়ে বিভিন্ন সময় নির্দেশনা দেওয়া হলেও বাস্তব চিত্র নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট থানার পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বলা হয়েছে, অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হয় এবং নিয়মিত নজরদারি চলছে।আইনজীবীদের মতে, অনুমোদন ছাড়া আবাসিক হোটেল পরিচালনা, অসামাজিক কার্যকলাপ, মানবপাচার ও মাদক ব্যবসা এসবের বিরুদ্ধে একাধিক আইনে মামলা করা সম্ভব। কিন্তু বাস্তবে মামলা প্রমাণ করা কঠিন, সাক্ষ্যসংগ্রহ দুর্বল হলে অভিযুক্তরা দ্রুত জামিন পেয়ে যায়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এক কর্মকর্তা বলেন, অভিযান চালানোই শেষ কথা নয়। শক্ত প্রমাণ ও ধারাবাহিক নজরদারি ছাড়া স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। এ ধরনের সিন্ডিকেট শুধু আইন ভঙ্গ করছে না, বরং সামাজিক কাঠামোকেও ক্ষতিগ্রস্ত করছে। যুবসমাজের মধ্যে মাদক বিস্তার, নারী নির্যাতন, অর্থপাচার সব মিলিয়ে একটি অন্ধকার অর্থনীতি তৈরি হচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ক্ষতিগ্রস্ত হবে। শুধু অভিযান নয়, সামাজিক প্রতিরোধও জরুরি।আরও পড়ুন, চকচকে রেস্তোরাঁর আড়ালে নোংরা রান্নাঘর, অভিযানে ‘কাচ্চি ডাইনে’ জরিমানা ৩ লাখরাজধানীর অন্তরে আবাসিক হোটেলের আড়ালে যদি নারী শোষণ, মাদক ব্যবসা ও মানবপাচারের মতো গুরুতর অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হয়, তবে তা জননিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি। প্রশাসনের নীরবতা বা শিথিলতা—যদি থেকে থাকে তা অপরাধচক্রকে আরও শক্তিশালী করে তুলবে। তবে অভিযোগ মানেই দোষ প্রমাণ নয় এ বিষয়টিও স্মরণীয়। সংশ্লিষ্ট হোটেল মালিকদের বক্তব্য এখনো পাওয়া যায়নি। নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য উদঘাটন এবং দোষীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণই হতে পারে একমাত্র গ্রহণযোগ্য পথ। রাজধানীর সামাজিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় এখন প্রয়োজন স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও কঠোর প্রয়োগ—যাতে আবাসনের নামে কোনো অবৈধ অন্ধকার সাম্রাজ্য গড়ে না ওঠে। এবিষয়ে অপরাধীদের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করলে তাদেরকে পাওয়া যায়নি।
সম্পাদক ও প্রকাশক: এ বি এম মনিরুজ্জামান
নির্বাহী সম্পাদক: রিপন রুদ্র
যুগ্ম সম্পাদক: জাকিয়া সুলতানা (লাভলী)
কপিরাইট © ২০২৬ দৈনিক সংবাদ দিগন্ত । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত