প্রিন্ট এর তারিখ : ১৬ জুন ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
বাংলাদেশের নির্বাচনী ইশতেহার অঙ্গীকার ও বাস্তবতার- ওয়াসিম ফারুক
ওয়াসিম ফারুক, , বিশেষ প্রতিবেদক, দৈনিক সংবাদ দিগন্ত ||
বাংলাদেশে ইশতেহারভিত্তিক রাজনীতির শুরু হয়েছিল সেই পাকিস্তান শাসনামলে আমলেই। ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন ছিল এ ভূখণ্ডে ইশতেহার রাজনীতির প্রথম বড় দৃষ্টান্ত। যুক্তফ্রন্টের ২১ দফা কর্মসূচি তৎকালীন পূর্ব বাংলার মানুষের ভাষা, অর্থনৈতিক অধিকার ও প্রশাসনিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে গণআকাঙ্ক্ষার সুস্পষ্ট প্রতিফলন ঘটায়। যদিও সেই সরকার দীর্ঘস্থায়ী হয়নি, তবু জনগণের কাছে এটি পরিষ্কার হয়ে যায় যে ইশতেহার কেবল কাগুজে ঘোষণা নয়, বরং রাজনৈতিক আন্দোলনের ভিত্তিও হতে পারে। এই ধারাবাহিকতা আরও দৃঢ় হয় ১৯৬৬ সালের ছয় দফার মাধ্যমে, যা কার্যত একটি রাজনৈতিক ইশতেহার হয়েই পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসনের দাবি ঘরে ঘরে পৌঁছে দেয়।১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ছয় দফা জনগণের বিপুল ম্যান্ডেট অর্জন করে এবং ইশতেহারের বাস্তবতা তখন এক ভিন্ন মাত্রা পায়। এটি আর শুধু নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ছিল না বরং স্বাধীনতা সংগ্রামের রূপরেখায় পরিণত হয়। স্বাধীনতার পর ১৯৭৩ সালের প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ইশতেহারে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠন, সংবিধান প্রণয়ন, সমাজতান্ত্রিক অর্থনৈতিক কাঠামো, জাতীয়করণ ও সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রতিশ্রুতি অন্তর্ভুক্ত ছিল। বাস্তবতায় সংবিধান প্রণয়ন ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান গঠনে দ্রুত অগ্রগতি হলেও জাতীয়করণ নীতি, প্রশাসনিক দুর্বলতা ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার সীমাবদ্ধতায় বহু প্রতিশ্রুতি কাঙ্ক্ষিত ফল দেয়নি। দুর্নীতি, দুর্ভিক্ষ ও রাজনৈতিক অস্থিরতা ইশতেহারের আদর্শিক উচ্চতা ও বাস্তবতার মধ্যে একটি গভীর ব্যবধান তৈরি করে।১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ইশতেহার রাজনীতি কার্যত থমকে যায়। সামরিক শাসনের সময় নির্বাচন ও ইশতেহার মূলত ক্ষমতাকে বৈধতা দেওয়ার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়। জিয়াউর রহমান ও পরবর্তীতে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের শাসনামলে ‘উন্নয়ন’, ‘উৎপাদন’ ও ‘শৃঙ্খলা’র কথা ইশতেহারে থাকলেও অংশগ্রহণমূলক গণতন্ত্র, জবাবদিহি ও রাজনৈতিক স্বাধীনতার প্রতিফলন ছিল সীমিত। এই সময় ইশতেহারের আদর্শিক দিকের চেয়ে ব্যক্তিনির্ভর ক্ষমতার রাজনীতিই বেশি দৃশ্যমান হয়।নব্বইয়ের গণ-অভ্যুত্থান বাংলাদেশের ইশতেহার রাজনীতিতে এক গুরুত্বপূর্ণ মোড় নিয়ে আসে। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে প্রায় সব প্রধান দলই গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা, সংসদীয় ব্যবস্থা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও মানবাধিকার রক্ষার প্রতিশ্রুতি দেয়। এই সময় ইশতেহারের ভাষা তুলনামূলকভাবে আধুনিক ও নীতিনির্ভর হয়ে ওঠে। বিএনপি ক্ষমতায় এসে সংসদীয় ব্যবস্থা পুনর্বহাল করলেও দলীয়করণ, রাজনৈতিক সহিংসতা ও বিরোধী দলের প্রতি অসহিষ্ণুতা ইশতেহারের আদর্শিক অঙ্গীকারকে ক্ষুণ্ন করে।১৯৯৬ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ‘দিন বদলের সনদ’ ইশতেহার রাজনীতিতে নতুন এক ভাষা যোগ করে। খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা, বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ, পরিবেশ ও নদী রক্ষা এবং পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি জনগণের মধ্যে আশার সঞ্চার করে। পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি নিঃসন্দেহে একটি ঐতিহাসিক অর্জন হলেও বিদ্যুৎ, কর্মসংস্থান ও দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে প্রত্যাশা পুরোপুরি পূরণ হয়নি। তবু এই সময় ইশতেহার যে রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণে প্রভাব ফেলতে পারে, সেই ধারণা আরও শক্তিশালী হয়।২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট আইনশৃঙ্খলা উন্নয়ন, দুর্নীতি দমন ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশের প্রতিশ্রুতি দেয়। বাস্তবে কিছু অবকাঠামো উন্নয়ন হলেও রাজনৈতিক সহিংসতা, জঙ্গিবাদ ও দুর্নীতি বিতর্ক ইশতেহারের বিশ্বাসযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। এই সময় ইশতেহার ও বাস্তবতার ফারাক জনগণের চোখে আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।২০০৮ সালের নির্বাচন বাংলাদেশের ইশতেহার রাজনীতিতে এক নতুন অধ্যায় সূচনা করে। ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ ধারণা তথ্যপ্রযুক্তি, সেবা খাত ও প্রশাসনিক আধুনিকায়নের প্রতিশ্রুতি দেয়। বিদ্যুৎ উৎপাদন, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি ও অবকাঠামো খাতে অগ্রগতি বাস্তবতায় দৃশ্যমান হয়। তবে একই সঙ্গে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, বিরোধী রাজনীতির পরিসর ও নির্বাচন ব্যবস্থার নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন বাড়তে থাকে। উন্নয়ন সূচক ও গণতান্ত্রিক সূচকের মধ্যে দ্বন্দ্ব ক্রমেই স্পষ্ট হয়।আরও পড়ুন, সৌদি রোডম্যাপ অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ে বাড়ি ভাড়া সম্পন্ন২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের তথাকথিত নির্বাচনগুলোতে ইশতেহার অনেকাংশে উন্নয়ন পরিকল্পনার ঘোষণাপত্রে রূপ নেয়। অবকাঠামো ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সাফল্য তুলে ধরা হলেও জবাবদিহি, ভোটাধিকার ও রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা সহ গনতন্ত্রের সকল স্তম্ভ গুলি অনুপস্থিত থাকায় ঐসকল ইশতেহার ছিল সম্পুর্ন ভিত্তিহীন এবং জনগনের সাথে প্রতারণারনামান্তর। ইশতেহার তখন আর ভবিষ্যতের প্রতিশ্রুতি নয়, বরং অতীতের সাফল্যের তালিকায় পরিণত হয়। বাংলাদেশের ইশতেহার রাজনীতির সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো অঙ্গীকার ও বাস্তবায়নের মধ্যকার বিশাল ব্যবধান। বিভিন্ন নাগরিক সংগঠনের পর্যালোচনায় দেখা যায়, ক্ষমতায় যাওয়ার পর দলগুলো ইশতেহারের গড়ে মাত্র ২০ থেকে ৩০ শতাংশ প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করতে পারে। দুর্নীতি দমন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, অর্থনৈতিক বৈষম্য হ্রাস ও বাকস্বাধীনতা প্রতিটি ক্ষেত্রেই ইশতেহারের ভাষা ও বাস্তবতার মধ্যে গভীর ফারাক রয়ে গেছে। এই ব্যর্থতার পেছনে রয়েছে অবাস্তব প্রতিশ্রুতি, জবাবদিহির অভাব ও দলীয়করণের সংস্কৃতি। ইশতেহার পূরণ না হলে দলগুলোকে আইনি বা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে চ্যালেঞ্জ করার কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেই। ফলে ইশতেহার একটি নৈতিক ঘোষণার বেশি কিছু হয়ে উঠতে পারে না।তবু ইশতেহারকে পুরোপুরি অর্থহীন বলা যাবে না। এটি রাজনৈতিক বিতর্কের ভাষা নির্ধারণ করে, নাগরিক প্রত্যাশাকে দৃশ্যমান করে এবং ভবিষ্যৎ নীতির দিকনির্দেশনা দেয়। প্রশ্ন হলো—এই ইশতেহারকে কীভাবে বাস্তব অর্থে জনগণের আস্থার দলিলে রূপান্তর করা যায়। ২০২৬ সালের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের মানুষ এখন আর কেবল ভাষার কারুকাজে তুষ্ট হতে চায় না। সাম্প্রতিক বছরগুলোর সামাজিক ও রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা নাগরিকদের মধ্যে এক ধরনের রাজনৈতিক সচেতনতা তৈরি করেছে। তাই ভবিষ্যতের ইশতেহার হওয়া উচিত বাস্তবসম্মত, সময়সীমাবদ্ধ ও জবাবদিহিমূলক। ইশতেহারে শুধু কী করা হবে তা নয়, কীভাবে, কখন এবং কোন সম্পদ দিয়ে তা করা হবে তার স্পষ্ট রূপরেখা থাকা জরুরি। ইশতেহার কেবল ভোটের আগে বিলি করার লিফলেট নয়। এটি হওয়া উচিত জনগণ ও রাজনৈতিক দলের মধ্যকার একটি বাস্তব সামাজিক চুক্তি। এই চুক্তির বরখেলাপ হলে রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে দলগুলোকে দায়বদ্ধ করার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে না পারলে, বাংলাদেশের নির্বাচনী ইশতেহার ভবিষ্যতেও কেবল একটি সাহিত্যচর্চা হয়েই থেকে যাবে জনগণের আস্থা অর্জনের দলিল হয়ে উঠবে না।
সম্পাদক ও প্রকাশক: এ বি এম মনিরুজ্জামান
নির্বাহী সম্পাদক: রিপন রুদ্র
যুগ্ম সম্পাদক: জাকিয়া সুলতানা (লাভলী)
কপিরাইট © ২০২৬ দৈনিক সংবাদ দিগন্ত । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত