প্রিন্ট এর তারিখ : ১৬ জুন ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ২৯ জানুয়ারি ২০২৬
ডেস্ক ||
জুলাই আন্দোলনকারীরাই একদিন বিশ্বে নেতৃত্ব দেবে- এমন মন্তব্য করে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, দেশের জুলাই আন্দোলন যেমন নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছিল, তেমনই ডিজিটাল ডিভাইস অ্যান্ড ইনোভেশন এক্সপো তথ্যপ্রযুক্তি খাতে নতুন সম্ভাবনার উন্মোচন করবে। জুলাই আন্দোলনকারীরাই একদিন বিশ্বে নেতৃত্ব দেবে। জুলাই অভ্যুত্থানে ইন্টারনেট বন্ধ করার পর যে বিক্ষোভ তৈরি হয়েছিল, তার কারণেই মহাশক্তিশালী এক সরকারের পতন ঘটেছিল।বুধবার রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে (বিসিএফসিসি) ‘ডিজিটাল ডিভাইস অ্যান্ড ইনোভেশন এক্সপো-২০২৬’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধান উপদেষ্টা এসব কথা বলেন। দ্রুত পরিবর্তনশীল বিশ্বের সঙ্গে তাল মেলাতে দেশে প্রযুক্তিগত অগ্রগতি জোরদারের ব্যাপারে গুরুত্বারোপ করে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ভবিষ্যৎ গড়ে উঠবে প্রযুক্তির হাত ধরেই।জালিয়াতিতে বাংলাদেশ বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন এমন মন্তব্য করে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, বাংলাদেশ পৃথিবীর চ্যাম্পিয়ন কীসে, জালিয়াতিতে। সব জিনিস জাল, বহু দেশ আমাদের পাসপোর্ট গ্রহণ করে না, ভিসা জাল, পাসপোর্ট জাল। তিনি বলেন, ‘আপনারা নিশ্চয় পত্রিকায় দেখেছেন, ‘আমেরিকান বেস অব জাল’ এটা একটা জালিয়াতের কারখানা বানিয়েছি আমরা।’প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘বাংলাদেশ একটা বিষয়ে পৃথিবীর চ্যাম্পিয়ন, এখন আপনাদের সবার জানা আছে হয়তো, তবুও আমি আবার বলব। বাংলাদেশ পৃথিবীতে চ্যাম্পিয়ন কীসে, জালিয়াতিতে। সব জিনিস জাল, বহু দেশ আমাদের পাসপোর্ট গ্রহণ করে না, ভিসা জাল, পাসপোর্ট জাল। আপনারা নিশ্চয় পত্রিকায় দেখেছেন- ‘আমেরিকান বেস অব জাল’ এটা একটা জালিয়াতের কারখানা বানিয়েছি আমরা। আমাদের বুদ্ধি আছে, না হলে করতে পারতাম না। কিন্তু খারাপ কাজে লাগাচ্ছে। যে জালিয়াতি করতে জানে, তার আছে অনেক ক্রিয়েটিভিটি।’তিনি বলেন, ‘আমি মধ্যপ্রাচ্যের একটা রাষ্ট্রের মন্ত্রীর সঙ্গে আলাপ করছিলাম, তারা বহুদিন ধরে আমাদেরকে প্রবেশাধিকার দিচ্ছে না। বাংলাদেশি কোনো মানুষকে প্রবেশের অধিকার দেবে না। এমনকি আমি যেটা তাদের বোঝানোর চেষ্টা করার জন্য, সর্বনিম্ন আমাদের যে মেরিনার, যারা জাহাজ চালান, দুনিয়াতে প্রাউড অব লিডিং ইন্ডাস্ট্রি, তারা জাহাজ চালান দুনিয়াতে। তারা এক বন্দর থেকে আরেক বন্দর, সেই তাদের ওই দেশের বন্দরে যখন জাহাজ আসে, তখন কয়দিনের জন্য তারা ছুটি পান শহরে গিয়ে একটু ঘোরাফেরা করেন, আসা-যাওয়া করতে পারেন।জাহাজ ছেড়ে স্থলে আসতে পারেন। তারা বাংলাদেশি নাগরিক হলে ওই দেশে তাকে নামতে দেওয়া হয় না। আমি শুধু মিনতি জানালাম যে, বেচারারা জাহাজে জাহাজে ঘুরেন, অন্তত তাদের জন্য একটা পারমিশন দাও। তিনি (মন্ত্রী) বলছেন, আমাদের নিয়ম তো সবার জন্য প্রযোজ্য, আমরা কী করি! আমি বললাম-তুমি আমার আবেদনটা গ্রহণ করো, শুধু তাদের জন্য দাও, আর যদি মনে করো। তো কয়েক মাস পরে শুনলাম যে, তারা মেরিনারদের পারমিশন দিয়েছে।’প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘বাংলাদেশিরা রিজেক্টেড হয়ে যাচ্ছে কেন? নানাজনের কাগজপত্র দেখলাম, শিক্ষার সার্টিফিকেট ভুল, জালিয়াত বলছে। একজন নারী যিনি আসছেন ডাক্তার হয়ে, তার ভিসা হলো ডাক্তারের ভিসা। আমি দেখেই বুঝলাম- ডাক্তার হবার তার কোনো ক্ষমতা নাই। তার চেহারায় বলে না ডাক্তারের কিছু আছে। আমি জিজ্ঞেস করলাম, আপনি কোন মেডিক্যাল থেকে পাস করেছেন? তখন কাগজপত্র ঘেঁটে একজনে বের করে দিল মেডিক্যাল সার্টিফিকেট। তো স্টাফরা বলেন, স্যার এটা জাল, ভুয়া। বাকি সব সার্টিফিকেট তার জাল। তিনি বললেন, আমার অ্যাসেসমেন্টে সুবোধ কাজ, ঢুকতে পারমিশন দিলে তিনি গৃহকর্মী হবেন। কিন্তু নিয়ে এসেছেন ডাক্তারের সার্টিফিকেট।’হতাশা প্রকাশ করে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘কী হবে আমাদের! এই প্রযুক্তির কথা বলছি যে, এই প্রযুক্তি তিনি জালিয়াতির কাজে লাগাবেন, যদি না আমরা আগের থেকে নিজেদের সংশোধন করি। হাজারে হাজারে মানুষ নানা ভুয়া সব পারমিশন, ভুয়া ব্যাংক সার্টিফিকেট এবং আমরা ইস্যু করছি। সেগুলো এবং জেনুইনলি ইস্যু করছি। যেখান থেকে যাবার কথা সেখান থেকে ইস্যু করছি। কাজেই আমাদের প্রযুক্তিতে আসতে হলে ন্যায্য জিনিস নিয়ে আসতে হবে। এদেশ জালিয়াতের কারখানা হবে না, এটাকে আমরা করতে চাই না। আমরা নিজ গুণে দেশে, সারা দুনিয়াতে মাথা উঁচু করে চলতে চাই এবং সেই সামর্থ্য আমাদের আছে।’ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, ‘চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান আমাদের সামনে অনেক সম্ভাবনার দরজা খুলে দিয়েছে। যার নেতৃত্বে ছিল তরুণরা। এই তরুণরাই নতুন বাংলাদেশের নেতৃত্ব দেবে, শুধু বাংলাদেশ নয়-তারা গোটা বিশ্বের নেতৃত্ব দেবে। তাদের কোনোটাতে ঘাটতি নাই। আমরা শুধু টেনে রাখছি তাদের। তাদের ছেড়ে দিলে তারা ঘুড়ির মতো উড়ে বেড়াবে। বর্তমান তরুণ প্রজন্ম আগেকার প্রজন্ম থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। আমরা দেখতে একরকম, কথা বলি একরকম, মানুষ আমরা ভিন্ন। তারা আমাকে অনেক পেছনে ফেলে চলে গেছে। যেহেতু আমি এত কম স্পিডে হাঁটি, সে আমার সঙ্গে পাল্লা দিতে পারে না। সে বিরক্ত হয়ে আমাকে ছেড়ে চলে যাচ্ছে।’তিনি বলেন, ‘আজকের তরুণরা পৃথিবীর ইতিহাসে সবচাইতে শক্তিশালী প্রজন্ম। এটা বিশ্বব্যাপী যেসব প্রজন্ম, এটা পৃথিবীর ইতিহাসে এত শক্তিশালী প্রজন্ম আর হয় নাই। এমন শক্তিশালী তারা কি সর্বকালের শক্তিশালী, না সর্বকালের সর্বশক্তি শক্তিশালী না- এর পরের প্রজন্ম এর থেকে আরও বেশি শক্তিশালী হবে। এই দুই প্রজন্মের মুখ দেখাদেখি হবে না, এভাবে এটা চলবে। এই শক্তিটাকে আমরা কাজে লাগাতে পারছি। তাকে রিকগনাইজ করতে পারছি না। তাকে রিকগনিশন দিলে সে এগিয়ে আসতে পারত, কাজটা করতে পারত। এই যে পরিবর্তন, এই যে শক্তিশালী হয়েছে- তার এসেন্সটা হলো প্রযুক্তি। ওর কারণেই সে ভিন্ন, সে আমার ছেলে আমার মেয়ে, কিন্তু ওই যে বললাম, তার কাছে আমি গুহাবাসী, যেহেতু তার কাছে ওই শক্তি আলাদিনের চেরাগ, তার হাতে এই আলাদিনের চেরাগ দিয়ে- সে যা ইচ্ছা তাই করতে পারে।’প্রধান উপদেষ্টা আরও বলেন, ‘গত অভ্যুত্থানের একটা কথা স্মরণ করছি, সবাই এর সঙ্গে পরিচিত। ইন্টারনেট যখন বন্ধ করে দেওয়া হলো, সব তরুণ সারাদেশে বিক্ষুব্ধ হয়ে গেছে। সে বিক্ষোভের পরিমাণ এত ছিল, তারা ফুটন্ত তেলের মতো টগবগ করছিল। কী হয়েছে? ইন্টারনেট বন্ধ করে দিয়েছে। এখন বুঝতে পারেন ইন্টারনেটটা তার প্রাণের কত প্রিয় জিনিস। এটা সহ্য করতে পারছে না। এমন টগবগ করল এই উত্তেজনায় শেষ পর্যন্ত একটা মহাশক্তিশালী একটা সরকারকে পালাতে হলো। এই ইন্টারনেট বন্ধ তার একটা বড় ভূমিকা রেখেছিল।’অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, ‘আগামী পৃথিবী মৌলিকভাবে ভিন্ন হবে। আজ যা আমরা কল্পনাও করতে পারছি না, সেটাই বাস্তবতায় পরিণত হবে। পৃথিবী দ্রুত বদলাচ্ছে। এই বৈশ্বিক গতির সঙ্গে যদি আমরা নিজেদের গতি বাড়াতে ও সামঞ্জস্য আনতে না পারি, তাহলে আমরা কতটা পিছিয়ে পড়ব, তা ভেবে দেখা দরকার। দেখে মনে হতে পারে বাংলাদেশ অন্যদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগোচ্ছে, কিন্তু বাস্তবে আমরা অনেক ক্ষেত্রেই পিছিয়ে-চিন্তায় পিছিয়ে, কাজে পিছিয়ে এবং নিজেদের প্রস্তুতিতেও পিছিয়ে।’তিনি বলেন, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) খাতকে যথাযথ গুরুত্ব না দেওয়ার কারণেই এই পিছিয়ে পড়া। আইসিটিকে তিনি ‘মূল খাত’ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, ‘এই খাত থেকেই ভবিষ্যৎ তৈরি হবে। আমি এই খাতের কথা বলছি, কারণ- এটি একটি প্রধান খাত। ভবিষ্যৎ এই খাত থেকেই গড়ে উঠবে। অন্যান্য ঐতিহ্যবাহী খাতগুলো টিকে থাকবে ঠিকই। তবে, প্রযুক্তি খাতই হবে চালিকাশক্তি- হাওয়ার মতো, বাতাসের মতো; যা প্রতিটি খাতকে স্পর্শ করে নতুনভাবে রূপ দেবে। এ কারণে এখনই প্রস্তুতি শুরু করার ওপর জোর দিয়ে তিনি বলেন, এই খাতের নীতিমালা প্রণয়নে সংশ্লিষ্টদের প্রচলিত চিন্তাধারা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।’আরও পড়ুন, পরিবর্তনশীল বিশ্বের সঙ্গে তাল মেলাতে প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতি প্রয়োজন: প্রধান উপদেষ্টাএক্সপো প্রসঙ্গে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘এ ধরনের আয়োজনগুলোতে আমরা কী ধরনের আলোচনা করি, কী ধরনের ভবিষ্যৎ কল্পনা করি এবং সে অনুযায়ী কী ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো তৈরি করি দেশের ভবিষ্যৎ অনেকটাই তার ওপর নির্ভর করবে।’ প্রজন্মগত পরিবর্তনের বিষয়টি তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘আজকের শিশুরা প্রযুক্তির সঙ্গে প্রায় সহজাতভাবেই যুক্ত। প্রজন্মগুলোর মধ্যে এই বাড়তে থাকা দূরত্ব একটি নেতৃত্ব সংকট তৈরি করছে। বয়স্ক প্রজন্ম তরুণদের নেতৃত্ব দিতে পারছে না কোনো খারাপ উদ্দেশ্যের কারণে নয়, বরং তাদের চিন্তাভাবনার ধরন এক নয়।’বাংলাদেশের আইসিটি খাতেও এখনো পুরোনো দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন রয়েছে উল্লেখ করে অধ্যাপক ইউনূস বলেন, ‘জনগণের দোরগোড়ায় সরকারি সেবা পৌঁছাতে প্রকৃত ডিজিটাল শাসনব্যবস্থা চালু করতে হবে। মানুষ সরকারের কাছে আসবে না, বরং সরকারি সেবা মানুষের কাছে যাবে। এটি বাস্তবায়ন করা গেলে দুর্নীতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে।’ চার দিনব্যাপী এই প্রযুক্তি প্রদর্শনীর আয়োজন করেছে আইসিটি বিভাগ, বাংলাদেশ হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষ (বিএইচটিপিএ) ও বাংলাদেশ কম্পিউটার সমিতি (বিসিএস)। ‘বাংলাদেশ টু দ্য ওয়ার্ল্ড’ প্রতিপাদ্যে আয়োজিত এই এক্সপো চলবে ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত।অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ে প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব। সভাপতিত্ব করেন তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি বিভাগের সচিব শীষ হায়দার চৌধুরী। স্বাগত বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মামুনুর রশীদ ভূঞা এবং বাংলাদেশ কম্পিউটার সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম।