প্রিন্ট এর তারিখ : ১৬ জুন ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ২৮ জানুয়ারি ২০২৬
বান্দরবানে জিরো টলারেন্স রক্ষায় কঠোর অবস্থানে, পুলিশ সুপার আবদুর রহমান
মো: ইনতাজ হোসেন,, বান্দরবান প্রতিনিধি: ||
বান্দরবান—পাহাড়, নদী আর বৈচিত্র্যময় জেলা। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের পাশাপাশি এই জেলার বাস্তবতা দীর্ঘদিন ধরেই জটিল। দুর্গম ভূগোল, সীমান্তঘেঁষা অবস্থান, পাহাড়ি জনপদ—সব মিলিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা এখানে সব সময়ই একটি বড় চ্যালেঞ্জ। সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় নতুন দৃষ্টিভঙ্গি ও দৃঢ় নেতৃত্ব নিয়ে এগিয়ে আসছেন বান্দরবান জেলার পুলিশ সুপার মো. আবদুর রহমান।২০২৫ সালের ২৯ নভেম্বর বান্দরবান জেলার পুলিশ সুপার হিসেবে যোগদান করেন মো. আবদুর রহমান। দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই তিনি স্পষ্ট করে জানিয়ে দেন—আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির কোনো বিকল্প নেই। অপরাধী যে-ই হোক, যত প্রভাবশালীই হোক, আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নয়—এই বার্তাই তিনি পৌঁছে দেন পুলিশ সদস্য থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের মাঝেও।যোগদানের পর প্রথম কয়েক সপ্তাহেই জেলার বিভিন্ন থানার কার্যক্রম, অপরাধের ধরন ও অপরাধপ্রবণ এলাকা সম্পর্কে বিস্তারিত ধারণা নেন পুলিশ সুপার। সেই সঙ্গে শুরু হয় বিশেষ অভিযান। মাদক, চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস, অবৈধ অস্ত্র, পাহাড়ি এলাকায় অপরাধী চক্রের তৎপরতার বিরুদ্ধে নেওয়া হয় সমন্বিত ও পরিকল্পিত ব্যবস্থা।পুলিশ সূত্রে জানা যায়, মো. আবদুর রহমান দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে অপরাধের হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। বিশেষ করে মাদকসংক্রান্ত অপরাধ, চুরি ও সন্ত্রাসী তৎপরতায় এসেছে দৃশ্যমান পরিবর্তন। অনেক এলাকায় রাতের বেলা মানুষের চলাচল এখন আগের তুলনায় নিরাপদ। একজন স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, আগে সন্ধ্যার পর বের হতে ভয় লাগত। এখন পরিস্থিতি অনেকটাই বদলেছে। পুলিশ আগের চেয়ে বেশি সক্রিয়, দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায়।”পুলিশ সুপার হিসেবে মো. আবদুর রহমান শুধু মাঠপর্যায়ের অভিযানে সীমাবদ্ধ থাকেননি। তিনি গুরুত্ব দিয়েছেন অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলায়ও। প্রতিটি থানা ও পুলিশ ফাঁড়ির কার্যক্রম নিয়মিত পরিদর্শন করছেন তিনি। আকস্মিক পরিদর্শনের মাধ্যমে থানার পরিবেশ, ডিউটির মান, অভিযোগ নিষ্পত্তির অগ্রগতি—সবকিছুই সরেজমিনে দেখছেন। পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, এই নিয়মিত পরিদর্শনের ফলে মাঠপর্যায়ের পুলিশ সদস্যদের মধ্যে দায়িত্ববোধ বেড়েছে। কাজে অবহেলা বা গাফিলতির সুযোগ কমে এসেছে।আইনশৃঙ্খলা রক্ষার পাশাপাশি মো. আবদুর রহমান গুরুত্ব দিয়েছেন পুলিশ সদস্যদের জীবনমান ও মৌলিক চাহিদার দিকেও। দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় কর্মরত অনেক পুলিশ সদস্য দীর্ঘদিন ধরেই বিশুদ্ধ পানির সংকট ও খাদ্যসংক্রান্ত সমস্যায় ভুগছিলেন। এই বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখেন পুলিশ সুপার। প্রতিটি পুলিশ ফাঁড়ি ও থানায় বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে উদ্যোগ নেওয়া হয়। পাশাপাশি খাবারের মান ও সরবরাহ ব্যবস্থার উন্নয়নে নির্দেশনা দেন তিনি। অনেক স্থানে রান্নাঘর ও খাবার সংরক্ষণের ব্যবস্থাও উন্নত করা হয়েছে।একজন কনস্টেবল বলেন, আগে অনেক কষ্ট ছিল। এখন স্যার নিজে এসে খোঁজ নেন—পানি ঠিক আছে কি না, খাবার কেমন। এতে আমাদের মনোবল অনেক বেড়েছে।” পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, মো. আবদুর রহমানের নেতৃত্বের বড় শক্তি হলো তার স্পষ্টতা ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি। তিনি একদিকে যেমন অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর, অন্যদিকে দায়িত্বশীল পুলিশ সদস্যদের জন্য সহানুভূতিশীল।আরও পড়ুন, লাইটারেজ সংকটে অচল চট্টগ্রাম বন্দর, ডেমারেজ গুনছে আমদানিকারকরাথানা ও ফাঁড়িতে কর্মরত সদস্যদের সঙ্গে খোলামেলা আলোচনা, সমস্যা শুনে তাৎক্ষণিক সমাধানের চেষ্টা—এই পদ্ধতি মাঠপর্যায়ে ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে। একজন ওসি বলেন, উনি শুধু নির্দেশ দেন না, কাজ বুঝিয়ে দেন। কোথায় সমস্যা, কীভাবে সমাধান করা যায়—সব বিষয়ে দিকনির্দেশনা দেন।”সাধারণ মানুষের স্বস্তি সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটি দেখা যাচ্ছে সাধারণ মানুষের অনুভূতিতে। বান্দরবানের বিভিন্ন উপজেলা ও পাড়া-মহল্লায় মানুষের মধ্যে এখন এক ধরনের স্বস্তি ফিরে এসেছে। অনেকেই বলছেন, পুলিশকে এখন আগের চেয়ে বেশি কাছে পাওয়া যায়।স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানান, চাঁদাবাজি ও ভয়ভীতি দেখিয়ে টাকা আদায়ের ঘটনা অনেক কমে গেছে। পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরাও নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতি নিয়ে সন্তুষ্ট। একজন হোটেল ব্যবসায়ী বলেন, পর্যটকেরা এখন নিরাপত্তা নিয়ে কম প্রশ্ন করে। এটা আমাদের জন্য ভালো লক্ষণ।” পুলিশ সুপার মো. আবদুর রহমানের লক্ষ্য শুধু অপরাধ দমন নয়, বরং একটি টেকসই আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা গড়ে তোলা। এর মধ্যে রয়েছে কমিউনিটি পুলিশিং জোরদার করা, পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর সঙ্গে পুলিশের সম্পর্ক আরও দৃঢ় করা এবং প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি বাড়ানো।তিনি মনে করেন, পুলিশের সঙ্গে মানুষের আস্থার সম্পর্ক গড়ে উঠলেই অপরাধ নিয়ন্ত্রণ সহজ হয়। বান্দরবান জেলার ইতিহাসে অনেক পুলিশ সুপার এসেছেন, গেছেন। কিন্তু মো. আবদুর রহমানের নেতৃত্বে যে দৃঢ়তা, শৃঙ্খলা ও মানবিকতার সমন্বয় দেখা যাচ্ছে, তা সাধারণ মানুষের মধ্যে নতুন প্রত্যাশা তৈরি করেছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় জিরো টলারেন্স নীতি, অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান এবং একই সঙ্গে পুলিশ সদস্যদের কল্যাণে আন্তরিক উদ্যোগ—এই তিনের সমন্বয়ই হয়তো বান্দরবানে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করবে।
সম্পাদক ও প্রকাশক: এ বি এম মনিরুজ্জামান
নির্বাহী সম্পাদক: রিপন রুদ্র
যুগ্ম সম্পাদক: জাকিয়া সুলতানা (লাভলী)
কপিরাইট © ২০২৬ দৈনিক সংবাদ দিগন্ত । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত