প্রিন্ট এর তারিখ : ১১ জুন ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ২১ জানুয়ারি ২০২৬
মব সন্ত্রাসে চ্যালেঞ্জের মুখে পুলিশ
রিপন রুদ্র: ||
রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে মামলা ও গ্রেপ্তারপ্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি ও তথ্য সংগ্রহের ক্ষমতাস্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক প্রশাসনিক কাঠামোপুলিশের আত্মরক্ষার স্পষ্ট আইনি সুরক্ষারাজনৈতিক চাপমুক্ত কর্মপরিবেশবর্তমান সময়ে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নতুন এক ধরনের সংকটের মুখোমুখি। তবে ডিএমপি ও ডিএমপির বাইরে অপরাধ দমনে পুলিশের তৎপরতা বাড়লেই একশ্রেণির রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় থাকা দুষ্কৃতকারীরা সংঘবদ্ধভাবে মব সৃষ্টি করে পুলিশের কাজে বাধা দিচ্ছে। কোথাও কোথাও দায়িত্ব পালনরত পুলিশ সদস্যদের গায়ে হাত তোলার ঘটনাও ঘটছে প্রকাশ্যে। এতে শুধু পুলিশের কাজের গতি ব্যাহত হচ্ছে না, বরং রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব ও আইনের শাসনও প্রশ্নের মুখে পড়ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রবণতা চলতে থাকলে সামনে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে। নির্বাচন এলেই রাজনৈতিক সহিংসতা বাড়ে—এটি নতুন নয়। তবে এবারের প্রেক্ষাপটে মব সন্ত্রাস একটি ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে, যা শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য নয়, পুরো রাষ্ট্রব্যবস্থার জন্যই বড় হুমকি হয়ে উঠছে।সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশে ‘মব কালচার’ বা সংঘবদ্ধ জনতার সহিংসতা আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। ছোটখাটো অপরাধ থেকে শুরু করে বড় ধরনের নাশকতা—সব ক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছে সংঘবদ্ধভাবে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা। বিশেষ করে রাজনৈতিক পরিচয় ও প্রভাবকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে একটি অংশ পুলিশের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। পুলিশ কোনো অপরাধীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে গেলেই মুহূর্তের মধ্যে মব তৈরি করে ভয়ভীতি দেখানো হচ্ছে। এতে অনেক সময় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশকে পিছু হটতে হচ্ছে, যা অপরাধীদের আরও সাহসী করে তুলছে।সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন এলাকায় দায়িত্ব পালনকালে পুলিশের ওপর হামলার ঘটনা বেড়েছে। কোথাও পুলিশের গাড়ি ভাঙচুর, কোথাও ইউনিফর্ম ধরে টানাহেঁচড়া, আবার কোথাও প্রকাশ্যে মারধরের ঘটনাও ঘটেছে। আইনশৃঙ্খলা বিশ্লেষকদের মতে, “পুলিশের ওপর হাত তোলা মানে সরাসরি রাষ্ট্রের ওপর হাত তোলা। কিন্তু বাস্তবতা হলো—এসব ঘটনায় অনেক ক্ষেত্রে দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হওয়ায় অপরাধীরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে। মব সৃষ্টির পেছনে রাজনৈতিক দাপট বড় ভূমিকা রাখছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। অপরাধীরা জানে রাজনৈতিক পরিচয় দেখাতে পারলে বা কোনো প্রভাবশালী মহলের নাম ব্যবহার করলে পুলিশ অনেক সময় সতর্ক হয়ে যায়। এই সংস্কৃতি আইনের শাসনের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। আইনের চোখে সবাই সমান—এই নীতি বাস্তবে কার্যকর না হলে সমাজে অপরাধ বাড়বেই। সামনে ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনকে ঘিরে এই রাজনৈতিক প্রভাব আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। নির্বাচন মানেই রাজনৈতিক উত্তেজনা, মিছিল, কর্মসূচি ও পাল্টাপাল্টি সংঘর্ষ। অতীত অভিজ্ঞতা বলছে, নির্বাচন ঘিরে সহিংসতা নিয়ন্ত্রণে রাখতে পুলিশের ওপর বাড়তি চাপ পড়ে। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে যখন পুলিশ নিজেরাই মবের আক্রমণের শিকার হচ্ছে, তখন নির্বাচনকালীন আইনশৃঙ্খলা রক্ষা আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এখনই যদি কঠোর সিদ্ধান্ত না নেওয়া হয়, তাহলে নির্বাচনকালীন সহিংসতা ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। পুলিশের সক্ষমতা বাড়াতে শুধু নির্দেশনা দিলেই হবে না—প্রয়োজন অভ্যন্তরীণ সংস্কার। পুলিশ সদস্যদের অভিযোগ, অনেক সময় দায়িত্ব পালনকালে তারা হয়রানির শিকার হন—মিথ্যা মামলা, প্রশাসনিক চাপ বা রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের মাধ্যমে। এই পরিস্থিতিতে পুলিশ যদি নির্ভয়ে কাজ করতে না পারে, তাহলে অপরাধ দমন কার্যকর হবে না। তাই পুলিশকে জনগণের নিরাপত্তা দিতে যাতে কোনো দ্বিধা না থাকে। বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পুলিশের কোনো একটি ভুল বা বিতর্কিত ঘটনা মুহূর্তেই ভাইরাল হয়ে যায়। কিন্তু পুলিশের ইতিবাচক কাজগুলো খুব কমই আলোচিত হয়। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে পুলিশের প্রতি নেতিবাচক ধারণা তৈরি হচ্ছে।বিশেষজ্ঞদের মতে, পুলিশের ভালো কাজগুলো তুলে ধরা এবং অন্যায় কাজের প্রতিবাদ—এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য না থাকলে সমাজে বিভ্রান্তি তৈরি হয়। এতে মব সৃষ্টিকারীরাই লাভবান হয়। মব সৃষ্টির ঘটনা শুধু নিন্দা করলেই থামবে না। প্রয়োজন দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা। যারা পুলিশের ওপর হামলা করছে বা দায়িত্ব পালনে বাধা দিচ্ছে—তাদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। বর্তমান বাস্তবতায় পুলিশকে কিছু অতিরিক্ত ও স্পষ্ট ক্ষমতা দিতে হবে, যাতে অপরাধীরা তদবির বা মব সৃষ্টি করে পার পেয়ে যেতে না পারে। তবে কোনো রাজনৈতিক চাপ উপেক্ষা করে আইন প্রয়োগের নিশ্চয়তা। আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় শুধু পুলিশের একক দায়িত্ব নয় জনগণের সহযোগিতাও অপরিহার্য। মব সৃষ্টি বা গুজবে কান না দিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে তথ্য দেওয়া এবং অপরাধের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়াই পারে পরিস্থিতি বদলাতে।বর্তমান সময়ে দেশের মব সৃষ্টিকারীরা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি হয়ে উঠেছে। পুলিশের কাজের গতি বাড়াতে হলে তাদের দিতে হবে পূর্ণ আস্থা, আইনি সুরক্ষা ও প্রয়োজনীয় অতিরিক্ত ক্ষমতা। সামনে ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন—এই সময়ে শক্ত ও কার্যকর পুলিশি ব্যবস্থা ছাড়া পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে পড়বে। পুলিশের ভুলের সমালোচনা যেমন প্রয়োজন, তেমনি তাদের ভালো কাজের স্বীকৃতিও জরুরি। অন্যথায় মব সংস্কৃতি আরও বিস্তার লাভ করবে এবং এর খেসারত দিতে হবে পুরো জাতিকে।আরও পড়ুন, পদ্মা গেস্ট হাউসে অনৈতিক কার্যকলাপএদিকে নজরুল ইসলাম নামের এক পথচারী বলেন, দেশের বর্তমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে আমরা সাধারণ মানুষ গভীর উদ্বেগের মধ্যে রয়েছি। ইদানীং দেখা যাচ্ছে, পুলিশ অপরাধ দমনে এগিয়ে এলে কিছু দুষ্কৃতকারী ও রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী মহল মব সৃষ্টি করে পুলিশের কাজে বাধা দিচ্ছে, এমনকি তাদের ওপর হামলাও চালাচ্ছে। এতে করে অপরাধীরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা চরমভাবে হুমকির মুখে পড়ছে। আমরা বিশ্বাস করি, পুলিশ যদি স্বাধীনভাবে ও নির্ভয়ে দায়িত্ব পালন করতে পারে, তাহলে সমাজে অপরাধ অনেকাংশে কমে আসবে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, দায়িত্ব পালনকালে পুলিশ নানা ধরনের হয়রানি ও চাপের শিকার হচ্ছে, যা মোটেও কাম্য নয়। সামনে জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এই সহিংসতা আরও বাড়ছে, যা গণতন্ত্রের জন্য অশনিসংকেত। আমরা চাই, সরকার পুলিশকে প্রয়োজনীয় আইনি সুরক্ষা ও কার্যকর ক্ষমতা দিক, যাতে তারা কোনো তদবির বা মবের ভয় ছাড়াই অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে পারে।অন্যদিকে নাম প্রকাশ্যে অনিচ্ছুক পুলিশের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, বর্তমান বাস্তবতায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করা বাংলাদেশ পুলিশের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমরা লক্ষ্য করছি, আইন প্রয়োগের সময় কিছু অপরাধী চক্র পরিকল্পিতভাবে মব সৃষ্টি করে পুলিশের কাজে বাধা দিচ্ছে এবং কখনো কখনো পুলিশের সদস্যদের ওপর হামলাও চালানো হচ্ছে। এটি শুধু পুলিশের জন্য নয়, পুরো রাষ্ট্র ও আইনের শাসনের জন্যই মারাত্মক হুমকি। পুলিশ কখনোই জনগণের বিরুদ্ধে নয়; বরং জনগণের জানমাল রক্ষা করাই আমাদের মূল দায়িত্ব। কিন্তু দায়িত্ব পালনের সময় অযৌক্তিক রাজনৈতিক চাপ, তদবির ও সামাজিক অপপ্রচার আমাদের কাজকে জটিল করে তোলে। সামনে ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সহিংসতার ঝুঁকি বেড়েছে, সে কারণে পুলিশ সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। আমরা চাই, পুলিশ সদস্যরা যেন নির্ভয়ে ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে পারে। এজন্য আধুনিক আইন, স্পষ্ট নির্দেশনা ও প্রয়োজনীয় আইনি সুরক্ষা অত্যন্ত জরুরি। একই সঙ্গে পুলিশ বাহিনীর অভ্যন্তরীণ সংস্কার, প্রশিক্ষণ ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করাও প্রয়োজন, যাতে কোনো সদস্য দায়িত্বের বাইরে গিয়ে ক্ষমতার অপব্যবহার না করতে পারে। জনগণের সহযোগিতা ছাড়া আইনশৃঙ্খলা রক্ষা সম্ভব নয়। পুলিশ ও জনগণের মধ্যে আস্থা ও পারস্পরিক সম্মানই পারে সহিংসতা, মব ও অপরাধ প্রতিরোধ করতে।
সম্পাদক ও প্রকাশক: এ বি এম মনিরুজ্জামান
নির্বাহী সম্পাদক: রিপন রুদ্র
যুগ্ম সম্পাদক: জাকিয়া সুলতানা (লাভলী)
কপিরাইট © ২০২৬ দৈনিক সংবাদ দিগন্ত । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত