প্রিন্ট এর তারিখ : ১৬ জুন ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ২০ জানুয়ারি ২০২৬
আতঙ্ক, অনিশ্চয়তা ও বাস্তবতার দ্বন্দ্বে কুষ্টিয়ার ইটভাটা শিল্প
ডেস্ক ||
কুষ্টিয়া জেলার ইটভাটাগুলো বাইরে থেকে স্বাভাবিক মনে হলেও ভেতরে চলছে চরম অনিশ্চয়তা ও আতঙ্কের দিন। প্রকৃতি, প্রশাসন ও নীতিগত জটিলতার ত্রিমুখী চাপে জেলার ইটভাটা শিল্প এখন গভীর সংকটে। প্রতিটি ভাটা মালিক প্রতিদিন কাজ শুরু করেন এই আশঙ্কা নিয়ে—আজ বৃষ্টি নামবে কি না, অভিযান হবে কি না, কিংবা হঠাৎ বন্ধের নির্দেশ আসবে কি না।প্রকৃতির ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল এই শিল্পে সূর্যের আড়াল হলেই দুশ্চিন্তা বাড়ে। আবহাওয়ার সামান্য পরিবর্তনেই উৎপাদন ব্যাহত হয়, লোকসানের মুখে পড়ে মালিকরা। তার ওপর যুক্ত হয়েছে প্রশাসনিক জটিলতা ও নীতিগত দ্বন্দ্ব। ভাটা মালিকদের অভিযোগ, একদিকে সরকার নির্ধারিত খাত হিসেবে ভ্যাট ও রাজস্ব আদায়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো সক্রিয়, অন্যদিকে পরিবেশ অধিদপ্তর জানিয়ে দিচ্ছে—বর্তমান কাঠামোতে ইটভাটা পরিচালনা বেআইনি। এরই ধারাবাহিকতায় জেলার বিভিন্ন উপজেলায় অভিযান চালিয়ে ভাটা ভেঙে দেওয়া ও কার্যক্রম বন্ধ ঘোষণা করা হচ্ছে।তবুও থেমে নেই এই শিল্প। কুষ্টিয়া জেলা ইটভাটা মালিক সমিতির সঙ্গে যুক্ত একাধিক মালিকের সঙ্গে কথা বলে উঠে এসেছে একই ধরনের বাস্তবতা ও ক্ষোভ। ভাটা মালিকরা জানান, ইটভাটা বন্ধ হয়ে গেলে শুধু আমরা নয়, পুরো উন্নয়ন কার্যক্রম থমকে যাবে। সরকারি-বেসরকারি ভবন, রাস্তা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় স্থাপনা—সবকিছুই ইটের ওপর নির্ভরশীল। শুধু ব্যবসা নয়, এলাকার মসজিদ, মন্দির, মাদ্রাসা, এতিমখানা নির্মাণসহ সামাজিক কাজেও আমরা সহযোগিতা করে থাকি। পাশাপাশি দরিদ্র মানুষের বিয়ে, সুন্নতে খতনা ও বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ডেও সহায়তা করি।”তথ্য অনুযায়ী, কুষ্টিয়া জেলায় বর্তমানে মোট ২১৬টি ইটভাটা রয়েছে। এর মধ্যে ৪২টি হাওয়া ভাটা। পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র রয়েছে মাত্র ৩টি ভাটার। চলতি বছরে এ সংক্রান্ত বিষয়ে ২২ জন ভাটা মালিক হাইকোর্টে রিট করেছেন। ভাটা মালিকদের দাবি, কুষ্টিয়া জেলা থেকেই প্রতিবছর সরকার প্রায় ১০ কোটি ৮০ লাখ টাকা ভ্যাট আদায় করে থাকে। এর সঙ্গে আয়কর ও অন্যান্য রাজস্ব যোগ হলে অঙ্কটি আরও বেড়ে যায়। অর্থাৎ এই শিল্প সরকারকেও একটি উল্লেখযোগ্য রাজস্ব সরবরাহ করে আসছে।আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো কর্মসংস্থান। জেলায় প্রায় ২০ হাজার শ্রমিক সরাসরি ইটভাটা শিল্পের সঙ্গে জড়িত। পরিবার-পরিজনসহ লক্ষাধিক মানুষের জীবিকা এই শিল্পনির্ভর। ভাটা বন্ধ হয়ে গেলে এসব শ্রমিকের বিকল্প কর্মসংস্থানের কোনো স্পষ্ট দিকনির্দেশনা নেই। ভাটা মালিকরা বলেন, আমরা মালিকরা হয়তো অন্য কোনো ব্যবসা করে টিকে থাকতে পারব। কিন্তু দিনমজুর শ্রমিকরা যাবে কোথায়? তাদের সন্তানদের পড়াশোনা, পরিবারের খরচ—সবই অনিশ্চয়তার মুখে পড়বে।”আরও পড়ুন, সুনামগঞ্জ ১ আসনের জনগণ আমার অভিভাবক কামরুজ্জামান কামরুলতাদের আরও দাবি, সরকার যদি নীতিগত কারণে ইটভাটা বন্ধ করতেই চায়, তাহলে তা ভাটা চালুর আগেই লিখিত নোটিশ দিয়ে জানানো উচিত। নির্ধারিত নীতিমালা ও বাস্তবসম্মত রূপান্তর পরিকল্পনা ছাড়া হঠাৎ অভিযান চালিয়ে ভাটা বন্ধ করা হলে এর দায় শুধু মালিক নয়, পুরো সমাজকেই বহন করতে হবে। সচেতন মহলের মতে, পরিবেশ রক্ষা অবশ্যই জরুরি। তবে একই সঙ্গে উন্নয়ন ও কর্মসংস্থান উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। ইটভাটা শিল্পের ক্ষেত্রে প্রয়োজন সমন্বিত নীতি, আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির ব্যবহার এবং ধাপে ধাপে রূপান্তর পরিকল্পনা। এতে একদিকে পরিবেশ সুরক্ষা নিশ্চিত হবে, অন্যদিকে রক্ষা পাবে হাজারো শ্রমিকের জীবন-জীবিকা এবং দেশের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড।সব মিলিয়ে কুষ্টিয়ার ইটভাটা শিল্প আজ এক গভীর সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে। এই সংকট থেকে উত্তরণে জরুরি ভিত্তিতে বাস্তবমুখী সিদ্ধান্ত ও কার্যকর সমাধানের দাবি জানিয়েছেন ভাটা মালিক, শ্রমিক এবং সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষ।
সম্পাদক ও প্রকাশক: এ বি এম মনিরুজ্জামান
নির্বাহী সম্পাদক: রিপন রুদ্র
যুগ্ম সম্পাদক: জাকিয়া সুলতানা (লাভলী)
কপিরাইট © ২০২৬ দৈনিক সংবাদ দিগন্ত । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত