প্রিন্ট এর তারিখ : ১১ জুন ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ১৭ জানুয়ারি ২০২৬
রিপন রুদ্র: ||
বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল ও উদ্বেগজনক রূপ ধারণ করছে। এয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক অস্থিরতা, সহিংসতা, হত্যা, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, নাশকতা এবং সংঘবদ্ধ বিশৃঙ্খলার ঘটনা প্রতিনিয়ত বাড়ছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে সাধারণ মানুষের জীবন ও জীবিকায়। নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে শহর থেকে গ্রাম সব স্তরের মানুষ। নির্বাচনকে ঘিরে রাজনৈতিক কর্মসূচি, পাল্টাপাল্টি আন্দোলন, মিছিল ও অবরোধে দেশের বিভিন্ন এলাকায় স্বাভাবিক জীবনযাত্রা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে মাঠে থাকলেও সংঘবদ্ধ মব সৃষ্টিকারী ও অপরাধীচক্রের তৎপরতায় পরিস্থিতি বারবার নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট মহল।গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নির্বাচন একটি স্বাভাবিক ও সাংবিধানিক প্রক্রিয়া। কিন্তু বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশে নির্বাচন এলেই রাজনৈতিক উত্তেজনা সহিংসতায় রূপ নেয়, যা নতুন কোনো ঘটনা নয়। তবে এবারের নির্বাচনী প্রেক্ষাপটে সহিংসতার মাত্রা ও বিস্তার অতীতের অনেক রেকর্ডকেও ছাড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি করেছে। নির্বাচন সামনে রেখে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের কর্মসূচিকে ঘিরে সংঘর্ষ, হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটছে। সড়ক অবরোধ ও যান চলাচলে বাধার কারণে পণ্য পরিবহন ব্যাহত হচ্ছে, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ব্যবসা-বাণিজ্য। সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী হচ্ছেন সাধারণ মানুষ—যাদের রাজনীতির সঙ্গে সরাসরি কোনো সম্পৃক্ততা নেই।এসব ঘটনার পেছনে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার অভিযোগও উঠছে বিভিন্ন মহল থেকে। এতে অপরাধীরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির এক বাস্তব চিত্র তুলে ধরছে। ফেসবুক, ইউটিউব, টিকটকসহ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে প্রতিদিন ছড়িয়ে পড়ছে সহিংস ঘটনার ভিডিও ও ছবি। কোথাও দেখা যাচ্ছে সংঘবদ্ধ ছিনতাই, কোথাও অস্ত্র হাতে মিছিল, আবার কোথাও পুলিশের উপস্থিতিতেই ভাঙচুর। এই দৃশ্যগুলো সাধারণ মানুষের মধ্যে গভীর আতঙ্ক ও হতাশা তৈরি করছে। অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন যদি প্রকাশ্যে অপরাধ সংঘটিত হয় এবং অপরাধীরা ভয় না পায়, তাহলে আইনের শাসন কোথায়?আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশের ভূমিকা অনস্বীকার্য। বর্তমান পরিস্থিতিতে পুলিশ মাঠে সক্রিয় রয়েছে নিয়মিত টহল, চেকপোস্ট স্থাপন, অভিযান পরিচালনা ও গ্রেপ্তার কার্যক্রম চলমান। রাজধানীসহ গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় বাড়ানো হয়েছে নিরাপত্তা ব্যবস্থা। তবে বাস্তবতা হলো, সংঘবদ্ধ মব সৃষ্টিকারীরা পুলিশের উপস্থিতিকেও তোয়াক্কা করছে না। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, দায়িত্ব পালনকালে পুলিশের ওপর সরাসরি হামলা চালানো হচ্ছে। পুলিশের গাড়ি ভাঙচুর, ইউনিফর্ম ধরে টানাহেঁচড়া এবং প্রকাশ্যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতি অবমাননাকর আচরণ করা হচ্ছে। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে পুলিশ শুধু একটি বাহিনী নয়, এটি রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বের প্রতীক। পুলিশের ওপর প্রকাশ্য হামলা মানে রাষ্ট্রের আইন ও শৃঙ্খলাকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করা। নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, এসব ঘটনা দেশের সার্বভৌমত্বের জন্য অশনিসংকেত। যখন জনগণ দেখে অপরাধীরা পুলিশের ওপর হামলা করেও পার পেয়ে যাচ্ছে, তখন আইন মানার প্রবণতা কমে যায়। এতে অপরাধ প্রবণতা বাড়ে এবং সমাজে নৈরাজ্য সৃষ্টি হয়।সাম্প্রতিক সময়ে দেশে ‘মব কালচার’ বা সংঘবদ্ধ জনতার সহিংসতা ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। রাজনৈতিক উসকানি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব ও বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে মুহূর্তেই তৈরি হচ্ছে উত্তেজিত জনতা। ফলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মব সংস্কৃতি দীর্ঘদিন চলতে থাকলে রাষ্ট্রের আইনভিত্তিক কাঠামো ভেঙে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। পুলিশ সদস্যদের অভিযোগ, রাজনৈতিক চাপ, জনবল সংকট ও আইনি সীমাবদ্ধতার কারণে অনেক ক্ষেত্রে তারা কঠোর ব্যবস্থা নিতে পারছেন না। আবার দায়িত্ব পালনের সময় হামলার শিকার হওয়ায় অনেক পুলিশ সদস্যের মনোবলেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।বিশেষজ্ঞদের মতে, পুলিশের মনোবল ভেঙে পড়লে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে। বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকারের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শুধু আশ্বাস বা বিবৃতি দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব নয়। প্রয়োজন বাস্তবমুখী ও কঠোর সিদ্ধান্ত। আইনের শাসনের মূল ভিত্তি হলো জনগণের আস্থা। কিন্তু অপরাধের শাস্তি নিশ্চিত না হলে এবং বিশৃঙ্খলা চলতে থাকলে সেই আস্থা ভেঙে পড়ে। বর্তমানে অনেক মানুষ রাতে বের হতে ভয় পাচ্ছেন, সন্তানদের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত, ব্যবসা পরিচালনায় অনিশ্চয়তায় ভুগছেন। এই আস্থা ফিরিয়ে আনতে হলে পুলিশকে কার্যকর ও দৃশ্যমান ভূমিকা পালন করতে হবে। গণতন্ত্র মানে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, কিন্তু তা কখনোই সহিংসতা ও নৈরাজ্যের অনুমতি হতে পারে না। আন্দোলনের নামে যদি মানুষের জীবন বিপন্ন হয় এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদ ধ্বংস হয়, তবে তা গণতন্ত্র নয় তা বিশৃঙ্খলা। রাষ্ট্রকে এখন সিদ্ধান্ত নিতে হবে—আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করবে, নাকি বিশৃঙ্খলাকে প্রশ্রয় দেবে।বর্তমান রাজনৈতিক অস্থিরতা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বাংলাদেশের জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা। এখনই কার্যকর ও কঠোর সিদ্ধান্ত না নিলে পরিস্থিতি আরও অবনতির দিকে যেতে পারে। জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়িত্ব। সেই দায়িত্ব পালনে পুলিশকে দিতে হবে পূর্ণ সমর্থন, স্পষ্ট নির্দেশনা ও প্রয়োজনীয় ক্ষমতা। অন্যথায় দেশে বিশৃঙ্খলা ঠেকানো কঠিন হয়ে পড়বে এবং এর মূল্য দিতে হবে পুরো জাতিকে।আরও পড়ুন, মুসহাফ না মোবাইল—কোনটিতে বেশি সওয়াবএদিকে একজন জ্যেষ্ঠ আইন বিশেষজ্ঞ বলেন, বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি কেবল একটি প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়, বরং এটি আইনের শাসনের জন্য একটি গুরুতর সতর্কবার্তা। সংবিধান অনুযায়ী নাগরিকের জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব। কিন্তু যখন প্রকাশ্য দিবালোকে সহিংসতা, ছিনতাই, চাঁদাবাজি ও মব সৃষ্টির ঘটনা ঘটে এবং তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে, তখন সাধারণ মানুষের আস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।তিনি বলেন, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যদের ওপর হামলা সরাসরি রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করার শামিল। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে পুলিশের ওপর হাত তোলার কোনো সুযোগ নেই। এসব ঘটনায় দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত না করা হলে অপরাধীরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠবে এবং সমাজে নৈরাজ্য বাড়বে।আইন বিশেষজ্ঞের মতে, মব সংস্কৃতি একটি বিপজ্জনক সামাজিক ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে। গুজব ও রাজনৈতিক উসকানিতে সংঘবদ্ধ জনতা যখন আইন নিজের হাতে তুলে নেয়, তখন বিচারব্যবস্থা অকার্যকর হয়ে পড়ে। এই প্রবণতা রুখতে হলে বিদ্যমান আইন কঠোরভাবে প্রয়োগের পাশাপাশি প্রয়োজন হলে বিশেষ আইন প্রণয়ন করতে হবে। তিনি আরও বলেন, পুলিশকে রাজনৈতিক চাপমুক্ত রেখে পেশাদারিত্বের সঙ্গে দায়িত্ব পালনের সুযোগ দিতে হবে। একই সঙ্গে সরকারকে স্পষ্ট নির্দেশনা দিয়ে জানাতে হবে—আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নয়। অন্যথায় আইনের শাসন ও গণতান্ত্রিক কাঠামো মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়বে।আরও পড়ুন, চাঁদাবাজ-ছিনতাইকারীদের লাগাম টানলেন ট্যুরিস্ট পুলিশের আপেল মাহমুদঅন্যদিকে একজন ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, “বর্তমান রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পুলিশ সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। রাজধানীসহ সারা দেশে টহল, চেকপোস্ট ও বিশেষ অভিযান জোরদার করা হয়েছে। জনগণের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই পুলিশের প্রধান দায়িত্ব। তিনি বলেন, “নির্বাচনকে ঘিরে কিছু সংঘবদ্ধ চক্র ও মব সৃষ্টিকারী আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে। দুঃখজনকভাবে দায়িত্ব পালনকালে পুলিশের ওপর হামলার ঘটনাও ঘটছে, যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। পুলিশের ওপর হামলা মানে রাষ্ট্রীয় আইন ও শৃঙ্খলার ওপর সরাসরি আঘাত।ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, পুলিশ আইন অনুযায়ী ধৈর্য ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছে। তবে কেউ যদি সহিংসতা, নাশকতা বা রাষ্ট্রীয় কর্তব্যে বাধা সৃষ্টি করে, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এক্ষেত্রে রাজনৈতিক পরিচয় কোনো বিবেচ্য বিষয় নয়। তিনি বলেন, গুজব ও অপপ্রচারে বিভ্রান্ত না হয়ে নাগরিকদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সহযোগিতা করার আহ্বান জানাচ্ছি। কোনো অপরাধ বা সন্দেহজনক তথ্য থাকলে নিকটস্থ থানায় বা জাতীয় জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯ুএ জানানোর অনুরোধ করছি। শেষে তিনি বলেন, পুলিশ জনগণের সঙ্গে রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে আমরা সর্বোচ্চ দায়িত্বশীলতার সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছি।