প্রিন্ট এর তারিখ : ১৬ জুন ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ১৩ ডিসেম্বর ২০২৫
সংবাদ দিগন্ত ||
ভোটের তফসিল ঘোষণার পরদিনই ঝরল এমন একজনের রক্ত যিনি ছিলেন জুলাই আন্দোলন এবং আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ আন্দোলনের অন্যতম পরিচিত মুখ; ঘোষণা দিয়েছিলেন ঢাকা-৮ আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার।এ ঘটনা ফের স্মরণ করিয়ে দিল রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ভেঙে পড়া আইনশৃঙ্খলার কথা; সঙ্গে নির্বাচন সামনে রেখে প্রার্থী ও ভোটারদের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কাও বাড়িয়ে দিল। ভোটের আগে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি কেমন হবে তা নিয়ে খোদ রাজনৈতিক দলগুলোরই উদ্বেগ ছিল। সেই উদ্বেগ যে অমুলক নয়, তা চোখে আঙুল দিয়ে দেখি দিল ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরীফ ওসমান বিন হাদিকে হত্যাচেষ্টার ঘটনা। নির্বাচন সামনে রেখে এ ধরণের 'লক্ষণ ভালো নয়' বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মুহাম্মদ নুরুল হুদা। তবে পরিস্থিতি পাঠ করতে গিয়ে আরেক ধাপ এগিয়ে শঙ্কার কথা বলেছেন নির্বাচন বিষয় বিশেষজ্ঞ এবং নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সদস্য আব্দুল আলিম।তার শঙ্কা, এরকম আরো ঘটলে, ফেব্রুয়ারির নির্বাচনই ‘অনিশ্চিত' হয়ে যেতে পারে।বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিয়ে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন এবং গণভোটের তফসিল ঘোষণা করেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার এএমএম নাসির উদ্দিন। ভোটাররা যেন নিরাপদে ও উৎসবমুখর পরিবেশে ভোট দিতে পারেন, সেজন্য সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়ে ১২ ফেব্রুয়ারি সবাইকে ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার আহ্বান জানান তিনি। সিইসি বলেন, যে কোনো ভয়ভীতি, প্রলোভন, প্রবঞ্চনা এবং সীমাবদ্ধতার ঊর্ধে উঠে নিঃসংকোচে আপনাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করুন। আপনাদের নিরাপদ ও উৎসবমুখর অংশগ্রহণকল্পে সংশ্লিষ্ট সকল প্রতিষ্ঠান ও বাহিনী কাজ করবে। তার সেই ভাষণ প্রচারের পর ২০ ঘণ্টা পার না হতেই ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরীফ ওসমান বিন হাদিকে গুলি করে হত্যার চেষ্টা করা হয়। শুক্রবার জুমার নামাজের পর রাজধানীর বিজয়নগরে বক্স কালভার্ট রোডে আক্রান্ত হন হাদি। তখন তিনি রিকশায় করে যাচ্ছিলেন। মোটরসাইকেলে করে আসা হামলাকারী পাশ থেকে তাকে গুলে করে। মাথায় গুলিবিদ্ধ হাদিকে ওই রিকশায় করেই ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে একদফা অস্ত্রোপচার সেরে রাত ৮টার পর নেওয়া হয় বসুন্ধরার এভারকেয়ার হাসপাতালে। অস্ত্রোপচার করা ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নিউরো সার্জারি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক জাহিদ রায়হান বলেছেন, হাদির অবস্থা ‘খুবই খারাপ’। তার বিষয়ে আশার কোনো কথা বলতে পারছেন না তারা। ঘটনার পর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি 'নাজুক পর্যায়ে' চলে যাওয়ার বিষয়টি সামনে এসেছে। পুলিশ মহাপরিদর্শক মো. বাহারুল আলম বলছেন, যারা এ হামলা চালিয়েছে, তাদের লক্ষ্য নির্বাচন ঘিরে ‘আতঙ্ক’ তৈরি করা। এটা ওরাই করেছে যারা নির্বাচনের ওপর একটা নেতিবাচক প্রভাব তৈরি করতে চায়। যারা চায় যে নির্বাচন না হোক ইত্যাদি ইত্যাদি… এটাকে আমরা সিরিয়াসলি দেখছি।ঢাকা-৮ আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন ইনকিলাব মঞ্চের নেতা হাদি। শুক্রবার দুপুরে জুমার নামাজের সময় মসজিদে মসজিদে ঘুরে ভোটের লিফলেট বিলি করতে বেরিয়েছিলেন তিনি। কথা ছিল লিফলেট বিলি শেষে সবাই সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে জড়ো হয়ে দুপুরের খাবার খাবেন, আলোচনা করবেন। এর মধ্যেই হাদির ওপর হামলার খবর আসে। এ ঘটনায় তাদের হাত দেখছেন নির্বাচন বিশেষজ্ঞ আব্দুল আলিম, যারা নির্বাচন চাইছে না। বড় দলগুলো সবাই কিন্তু এই তফসিলকে স্বাগত জানিয়েছে। সবাই। বড় দলগুলো। তাই না? তফসিলের আগে দলগুলোর মধ্যে বিভাজন থাকলেও, অন্যরকম কথাবার্তা থাকলেও, সবাই স্টেটমেন্ট দিয়ে তফসিলকে স্বাগত জানিয়েছে। কাজেই এটা হতে পারে, মানে যে কোনোভাবে হতে পারে। মানে যারা ইলেকশন চাচ্ছে না, ইলেকশনকে ভণ্ডুল করতে চায়, তাদেরই কাজ নিঃসন্দেহে।এ ঘটনা 'এলার্মিং' মন্তব্য করে তিনি বলেন, "যদি এগুলো কন্টিনিউ করে তাহলে তো পরিস্থিতি খারাপ হয়ে যাবেই। এলোমেলো হয়ে যাবে সবকিছু। তখন আর নির্বাচনের যে পরিবেশ, সেটা নষ্ট হয়ে যাবে। এবং এখনই এটাকে শক্ত হাতে কন্ট্রোল করতে হবে। এটার কোনো বিকল্প নাই। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশের সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন আব্দুল আলিম। তার পরামর্শ, সেনাবাহিনীকে পূর্ণ ক্ষমতা দিয়ে মাঠে নামানো হোক। শুধু পুলিশ দিয়ে তো আর ইলেকশন হয় না বাংলাদেশে। তাই না? আর এবার তো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারীর যে সংজ্ঞা, ডেফিনেশন, তাতে ম্যাজিস্ট্রেসি পাওয়ার দিয়ে মিলিটারিকেও মাঠে নামানোর সুযোগ আছে। সো পুলিশ না পারলে তাই করতে হবে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সব চেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ, আমি বারবার বলে আসছি। সো এটাকে ট্যাকল করতে না পারলেই আমাদের বিপদ হবে।নির্বাচন সামনে রেখে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর যে পরিমাণ নজরদারি বাড়ানোর প্রয়োজন ছিল তাতে উন্নতি দেখছেন না বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব পিস অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজের (বিআইপিএসএস) সভাপতি এ এন এম মুনিরুজ্জামান চব্বিশের অগাস্টে রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর যেসব সন্ত্রাসী কারাগার থেকে ছাড়া পেয়েছিল ও পালিয়ে গিয়েছিল, তাদের ধরতে না পারার ক্ষেত্রে দায়িত্বশীল সংস্থা ও বাহিনীর 'কর্মদক্ষতার অভাব' দেখছেন তিনি। মুনিরুজ্জামান বলেন, "এটা (এ ধরনের ঘটনা) হচ্ছে যে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ইতোমধ্যে একটা নাজুক পর্যায়ে ছিল। এবং নির্বাচনকে লক্ষ্য রেখে সেটা আরও অবনতি হওয়ার একটা আশঙ্কা আছে এবং ছিল। এ ব্যাপারে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, বিশেষ করে তাদের যারা নিয়ন্ত্রণ করেন অর্থাৎ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আগে থেকে আরও তৎপর হওয়া উচিত ছিল। কিন্তু সেই ধরনের কোনো তৎপরতা আমরা দেখতে পাইনি। তিনি বলেন, "এটা একটা বড় ধরনের সতর্কবার্তা, সেটা এখনই খুবই গুরুত্বের সাথে অনুধাবন করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং তাদের অধীনস্থ বাহিনীগুলোকে আরও তৎপর হতে হবে। তাদের কার্যকর বন্দোবস্ত, নজরদারি, সবকিছু মাঠ পর্যায়ে রাখতে হবে, যাতে করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের ভিতরে থাকে। তবে এখনই সেনাবাহিনীকে মোতায়েন করার পক্ষে নন মুনিরুজ্জামান। তিনি বলেন, "এত আগে থেকে সেনাবাহিনীকে মোতায়েন করলে সেনাবাহিনীর যে প্রধান দায়িত্ব থাকবে, সেটা কিছুটা ব্যাহত হয়ে যাবে। নির্বাচনকালীন সময়ে তাদের মোতায়েন করতে হবে। কিছু কিছু দায়িত্ব যেটা পুলিশের কাজ, পুলিশকে সে দায়িত্ব নিতে হবে। তার ভাষ্য, "যেসব সন্ত্রাসী জেল থেকে মুক্তি পেয়েছিল, পালিয়ে গিয়েছিল, তাদের এই গত এক-দেড় বছরে ধরতে পারেনি পুলিশ। কাজেই দক্ষতার যে অভাব আছে, সেটা শুধু দক্ষতা দিয়েই পূরণ করা যাবে। অন্য কোনোভাবে পূরণ করা যাবে না। এবং এটা নতুনভাবে আসছে না। এ ব্যাপারে আমরা যারা বিশ্লেষণ করি, আমরা অনেক দিন থেকে বলে আসছি যে, এসব ব্যাপারে দক্ষতা বৃদ্ধি করতে হবে, নজরদারি বৃদ্ধি করতে কিন্তু সে ধরনের কোনো উন্নতি আমরা দেখতে পাইনি। মুনিরুজ্জামান বলেন, "এর প্রধান কারণ হচ্ছে এখানে যে দায়িত্বশীল যে সংস্থা বা বাহিনীগুলো আছে, তাদের কর্মদক্ষতার অভাব, আর কিছু না।চলতি বছরের শুরুতে পরিচালিত একটি গবেষণার ফলাফলে দেখা যায়, বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের ৮০ শতাংশ শিক্ষার্থী ‘রাজনীতিমুক্ত’ স্বাধীন পুলিশ কমিশন গঠন দরকার বলে মনে করেন। সেই গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, “পুলিশ কর্মকর্তারা মূলত শাসনক্ষমতায় থাকা রাজনৈতিক দলের নেতাদের আদেশ বাস্তবায়ন ও ইচ্ছে পূরণে আগ্রহী। দায়হীন পুলিশ সরকারি দলের রাজনৈতিক যন্ত্রে পরিণত হয়েছে। রাজনৈতিক নেতা বা সরকারি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে পুলিশ অভিযোগ নিতে চায় না মতও গবেষণায় উঠে আসে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আয়োজিত এক সেমিনারে সেই প্রতিবেদনের তথ্য তুলে ধরেছিলেন শাসন ও নীতি বিষয়ক গবেষক দলের আহ্বায়ক কাজী মারুফুল ইসলাম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের এই অধ্যাপক মনে করেন, নির্বাচন সামনে রেখে অপরাধীদের ধরতে যে ধরনের 'সক্রিয়তা' থাকা দরকার ছিল, বাস্তবে তা নেই। ওসমান হাদির ঘটনার ব্ষিয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে মারুফুল ইসলাম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, "আমরা তো গত বছর থেকে এই পর্যন্ত, অর্থাৎ জুলাই আন্দোলন থেকে এই পর্যন্ত দেখছি যে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বাংলাদেশে এখনো পুরোপুরি স্বাভাবিক অবস্থায় পৌঁছায়নি। ঢাকায় এবং ঢাকার বাইরে সব জায়গাতেই আমরা দেখছি যে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো, তারা আসলে পূর্ণমাত্রায় সক্রিয় না। তো এই পরিস্থিতিতে আমরা তো প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও বিভিন্ন রকমের অপরাধ দেখছি। মারুফুল ইসলাম বলেন, "পুলিশের ভেতরের যে পরিবর্তন, তার যে রূপান্তর সেটি এখনো পর্যন্ত প্রত্যাশার কাছাকাছিও পৌঁছাতে পারেনি। ফলে আমরা বারবার করে দেখছি যে আসলে পুলিশ বাহিনীর কাছে যে জনগণের প্রত্যাশাযে তারা জান-মাল রক্ষা করবে, অপরাধীদেরকে ধরবে, তার যে কাজগুলো—সেই কাজগুলোতে এখনো পূর্ণ সক্রিয়তা দেখা যাচ্ছে না। নির্বাচন সামনে রেখে এখনও সংস্থাগুলো সচেতন না হলে নির্বাচনের 'শান্তিপূর্ণ পরিবেশ অর্জন কঠিন হবে’ বলে তার ধারণা।সাবেক আইজিপি মুহাম্মদ নুরুল হুদা মনে করেন, হাদিকে হত্যাচেষ্টার পেছনে নির্বাচন সামনে রেখে ‘ব্যক্তিগত শত্রুতা’ থাকতে পারে। আবার এটা ‘নির্বাচন বানচালের সহিংসতা’ও হতে পারে। বলেন, কোথায় কোথায় রাইভালরি বেশি আছে, কোথায় কোথায় শত্রুতা বেশি আছে, কোথায় কোথায় স্ট্রং ক্যান্ডিডেট আছে, সেই সব জায়গায় প্রিকশন নিতে হবে। এগুলো আগেও ঘটেছে এরকম। খুবই অভূতপূর্ব কিছু না। কিন্তু এটা আনফরচুনেট বেশি। এটা প্রিভেন্ট করতে হবে। সেটি কীভাবে করা যেতে পারে, তার ব্যাখ্যায় নুরুল হুদা বলেন, “তাদের ইনফরমেশন চ্যানেলগুলো অ্যাক্টিভেট করতে হবে এবং এখন অন্য কাজ বাদ দিয়ে এগুলোই, এটাকেই বেশি দেখতে হবে। ইলেকশন রিলেটেড যে ভায়োলেন্স, সেটার দিকে বেশি খেয়াল করতে হবে। সক্ষমতা একটু কম আছে। কিন্তু ঠিকমত লিডারশিপ থাকলে এবং ঠিকমত নির্দেশনা থাকলে যে ‘কাজ করে যান কোনো অসুবিধা নাই, কোনো অসুবিধা হবে না'–এরকম নির্দেশনা থাকলে এটা কাটিয়ে ওঠা কোনো কঠিন কাজ না। এর চেয়েও কঠিন সময় গেছে, অতএব এটা না পারার কারণ নাই। বর্তমান আইজিপি বাহারুল আলম বলছেন, নির্বাচনকে শঙ্কামুক্ত করতে যা যা দরকার, তার সবই তারা করবেন। যারা প্রার্থী হয়েছেন বা হবেন, পুলিশ তাদের বাড়তি নিরাপত্তা দেবে। কীভাবে তাদের নিরাপত্তা দেওয়া হবে জানতে চাইরে পুলিশ প্রধান বলেন, “দেখেন আমাদের কাছে কোন ঐশ্বরিক ক্ষমতা নেই। গত ২০-৫০ ধরে যে প্রক্রিয়ায় চলছে, এখনও সেই প্রক্রিয়াতেই হবে। তাদের সঙ্গে সশস্ত্র প্রহরী থাকবে, এটা গেল একটা বিষয়। আরেকটা হচ্ছে তার কী কী ভালনারেবিলিটি আছে, গোয়েন্দা সংস্থাগুলো তা নির্ধারণ করে, এরপর অ্যালার্ট করে। তাদের অ্যালার্ট করে যে এই জায়গায় কি ওই জায়গায় যাবেন না–ইত্যাদি আর কী।হাদি যে আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন, সেখানে বিএনপির প্রার্থী দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস। তিনি হাদিকে দেখতে বিকালে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সামনে গেলে ‘ভুয়া, ভুয়া’ স্লোগান শুরু করেন ইনকিলাব মঞ্চের সদস্য ও হাদির সমর্থকেরা। পরে সেনাবাহিনীর সদস্যরা মির্জা আব্বাসকে নিরাপত্তা দিয়ে হাসপাতালের ভেতরে প্রবেশ করার সুযোগ করে দেন। এ সময় ইনকিলাব মঞ্চের নেতাকর্মীরা আরও নানা স্লোগান দিতে থাকেন।এ আসনে জামায়াত থেকে কাকে মনোনয়ন দেওয়া হবে তা নিয়ে জল্পনা রয়েছে। আলোচনায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) ভিপি সাদিক কায়েমের নামও ছিল। তবে শিবির নেতা মু. সাজ্জাদ হোসাইন খানও প্রচারে নাম লিখিয়েছেন। এদিকে জামায়াতে ইসলামীর ফেইজবুক পেইজ থেকে এ আসনে হেলাল উদ্দিনের প্রচার চালাতে দেখা যায়। তার নামে পোস্টার সাঁটানো আছে নির্বাচনি এলাকার দেয়ালে দেয়ালে।হাদি আক্রান্ত হওয়ার পর বড় সবগুলো রাজনৈতিক দলই নিন্দা জানিয়েছে। এ ঘটনাকে ‘গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে চক্রান্ত’ আখ্যা দিয়েছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। শুক্রবার সন্ধ্যায় রাজধানীতে বিএনপির এক আলোচনাসভায় এ ঘটনার নিন্দা জানিয়ে তিনি বলেছেন, “আজকে শরীফ ওসমান বিন হাদির যে দুর্ঘটনা ঘটেছে, এই দুর্ঘটনা আরো ঘটেছে। কিছুদিন আগে চট্টগ্রামে আমাদের এক এমপি প্রার্থীর উপরে যা হয়েছে, এটা ষড়যন্ত্র। এটার বিরুদ্ধে যদি আমাদেরকে অবস্থান নিতে হয়, এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে যদি অবস্থান নিতে হয় যে কোনো মূল্যে আমাদেরকে গণতন্ত্রকে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে, যে কোনো মূল্যে আমাদের গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে ফিরিয়ে আনতে হবে, গণতান্ত্রিক অধিকারকে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। হাদিকে হত্যাচেষ্টার ঘটনা ‘নির্বাচন বানচালের ষড়যন্ত্র’ বলে মন্তব্য করেছেন মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।শুক্রবার বিকালে এক আলোচনা সভায় ওই ঘটনায় দুস্কৃতিকারীদের অবিলম্বে গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, “গতকালকে (বৃহস্পতিবার) নির্বাচনের শিডিউল ঘোষণা হয়েছে। আজকে একজন প্রার্থীকে গুলি করা হয়েছে ঢাকা-৮ আসনের হাদি সাহেব, ইনকিলাব মঞ্চের প্রার্থী। এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানাচ্ছি। আমি একটা অশনিসংকেত দেখতে পারছি যে, নির্বাচনকে বানচাল করার জন্য সেই শক্তি আবার চক্রান্ত শুরু করে দিয়েছে। এ ঘটনা নির্বাচনের জন্য অশনিসংকেত হিসেবে দেখছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশও। শুক্রবার দলের যুগ্মমহাসচিব ও মুখপাত্র মাওলানা গাজী আতাউর রহমান এক বিবৃতিতে গুলিবর্ষণকারী ও হুকুমদাতাকে দ্রুততম সময়ের মধ্যে গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়েছেন। বিবৃতিতে গাজী আতাউর রহমান বলেন, “ঢাকার বিজয়নগর এলাকার মত জনবহুল এলাকায় ইনকিলাব মঞ্চের ওসমান হাদি গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনায় ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করছে এবং নিন্দা জানাচ্ছে। জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান এ ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে দ্রুত ও স্বচ্ছ তদন্ত দাবি করেছেন।শুক্রবার ফেইসবুকে দেওয়া পোস্টে জামায়াতের আমির বলেন, “কোনো রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা বা মতভিন্নতার কারণে এ ধরনের সহিংসতা কখনোই গ্রহণযোগ্য নয়। এ ঘটনার প্রতিবাদে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিক্ষোভ ও সমাবেশ করেছেন ডাকসু নেতারা। শুক্রবার সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় বিক্ষোভ-সমাবেশ থেকে হাদির ওপর আক্রমণে জড়িতদের গ্রেপ্তারে সরকারকে ২৪ ঘণ্টা সময় বেঁধে দিয়ে কঠোর আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দেন তারা।হাদিকে গুলির ঘটনায় রাতে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় উপদেষ্টা পরিষদের কয়েকজন সদস্য এবং আইনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তাবাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তাদের নিয়ে জরুরি বৈঠক করেন প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস। বৈঠকে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, হাদির ওপর হামলা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মেয়াদকালে ‘অন্যতম উদ্বেগজনক ঘটনা।এই হামলা বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রার উপর সুপরিকল্পিত আঘাত। এর মাধ্যমে পরাজিত শক্তি দেশের অস্তিত্বকে চ্যালেঞ্জ করার দুঃসাহস দেখিয়েছে। এই ধরনের হামলার চেষ্টাকে আমরা যে কোনো মূল্যে ব্যর্থ করে দেব। জাতির ওপর এই ধরনের অপশক্তির আঘাত কোনোভাবেই বরদাশত করা হবে না। এই হামলার মাধ্যমে জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটকে ‘বানচাল করার ষড়যন্ত্র’ করা হচ্ছে মন্তব্য করে তিনি বলেন, “আমরা কোনো অবস্থাতেই এই ধরনের ষড়যন্ত্রকে সফল হতে দেব না। আঘাত যাই আসুক, যত ঝড় তুফান আসুক, কোনো শক্তিই আগামী নির্বাচনকে বানচাল করতে পারবে না।” তিনি বলেন, “আমরা দেশের আপামর জনগণকে সাথে নিয়ে আমাদের সম্মিলিত শক্তি দিয়ে জাতির জন্য একটি শান্তিপূর্ণ নির্বাচন নিশ্চিত করব। দ্রুততম সময়ের মধ্যে হাদির ওপর হামলাকারী এবং হামলার পরিকল্পনাকারীদের গ্রেপ্তার করার ওপর জোর দিয়ে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, “হামলাকারীরা যাতে কোনোভাবেই দেশ ছাড়তে না পারে, সেটি নিশ্চিত করতে হবে।