প্রিন্ট এর তারিখ : ১৬ জুন ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ১১ ডিসেম্বর ২০২৫
স্বাধীনতার স্বপ্নে জীবন উৎসর্গ করা নায়ক শহীদ আকরাম
মোহাম্মাদ বাবুল আকতার, প্রতিনিধি: ||
বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসে অনেক নাম অন্ধকারে ঢাকা পড়ে গেছে। সেই নীরব বীরদের একজন শহীদ শেখ আকরাম হোসেন। মাত্র ২৭ বছরের তরুণ বয়সে যশোরের মণিরামপুর উপজেলার এই কৃষিবিদ নিজের জীবন বিলিয়ে দিয়েছিলেন মুক্তিযুদ্ধের মহত্তম লক্ষ্যের জন্য। তার আত্মত্যাগ, নির্যাতনের বিভীষিকা ও অদম্য দেশপ্রেম এখনও এই অঞ্চলের মানুষের স্মৃতিতে অম্লান। ১৯৪৪ সালে উপজেলার শেখপাড়া খানপুর গ্রামে এক সাধারণ পরিবারে জন্ম আকরামের। আলতাফ হোসেন ও জোছনা খাতুনের আট সন্তানের মধ্যে তিনি ছিলেন একমাত্র পুত্র। সাধারণ পরিবারে বড় হলেও তিনি ছিলেন অসাধারণ দেশপ্রেমিক। ১৯৬৮ সালে মণিরামপুর পাইলট হাইস্কুল থেকে এসএসসি এবং পরে যশোর পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট থেকে কৃষি ডিপ্লোমা অর্জন করেন। ১৯৭১ সালে চাকরিরত ছিলেন চুয়াডাঙ্গার দত্তনগর কৃষি ফার্মে। ২৫ মার্চের গণহত্যা তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। আর দশজন তরুণের মতো তিনিও অস্ত্র হাতে নেন মাতৃভূমি রক্ষার জন্য। চাকরি ছেড়ে চলে আসেন এলাকায়, যোগ দেন মুক্তিবাহিনীতে। মণিরামপুর, বাঁকড়া, শার্শা ও কলারোয়া সীমান্ত এলাকায় পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে একাধিক সম্মুখযুদ্ধে বীরত্বের পরিচয় দেন তিনি। তবে রাজাকারদের নজর এড়ানো ছিল অসম্ভব। উপজেলার পাতনের ইয়াকুব কবিরাজের ছেলে কুখ্যাত রাজাকার মেহেরুল ইসলাম আকরামের মুক্তিযোদ্ধা পরিচয় জানতে পেরে ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। ১৯৭১ সালের অক্টোবরে এক রাতেআকরামকে বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয় স্থানীয় রাজাকার ক্যাম্পে। শুরু হয় অমানবিক নির্যাতন। টানা সাত দিন বেয়নেটের খোঁচা, দড়ির বাঁধন, ক্ষতস্থানে লবণ-লঙ্কা একটির পর একটি নিষ্ঠুরতা। মুক্তিবাহিনীর তথ্য আদায়ের নামে প্রতিদিন নতুন পদ্ধতিতে তাকে অত্যাচার করা হতো। তবু তিনি মুখ খুলেননি। তথ্য আদায় ব্যর্থ হলে তাকে নিয়ে যাওয়া হয় তাহেরপুর জুড়োনপুর রাস্তার মোড়ে। বাঁশের খুঁটিতে হাত-পা বেঁধে আবারো শুরু হয় নির্মমতা। পানি চাইলে পানির বদলে মুখে প্রস্রাব ঢালা হয়। ঘণ্টার পর ঘণ্টা নির্যাতনের একপর্যায়ে তিনি অচেতন হয়ে পড়েন; তারপরও জ্ঞান ফেরানোর পর শুরু হতো নতুন দফার বর্বরতা। শেষ পর্যন্ত সেই নিষ্ঠুরতার দগ্ধ শরীরেই তিনি মৃত্যুবরণ করেন।এলাকায় এরপর থেকেই মেহেরুল পরিচিত হয় ‘মেহের জল্লাদ’ নামে। ছেলের মৃত্যুসংবাদ শুনে শোক সইতে না পেরে কিছুদিন পরই মারা যান আকরামের মা জোছনা খাতুন। পরিবার তার লাশটিও পায়নি আজও গ্রামবাসীর হৃদয়ের ক্ষত হয়ে আছে। স্বাধীনতার পর সেই হত্যা কালের নামকরণ করা হয় ‘শহীদ আকরাম মোড়’। পরে মনিরামপুর-রাজগঞ্জ সড়কের নামও রাখা হয় শহীদ আকরাম হোসেনের নামে। দীর্ঘদিন চিহ্নিত না থাকলেও ২০১৩ সালে স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড ও তাহেরপুরবাসীর উদ্যোগে স্থাপন করা হয় প্রথম শ্রদ্ধাফলক। ২০২২ সালে হাজ্বী মো. নূর আলীর দানকৃত জমিতে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতায় নির্মিত হয় স্থায়ী স্থাপনা ‘বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ শেখ আকরাম স্মৃতি স্তম্ভ’। এখন সেই স্মৃতি স্তম্ভই তাহেরপুরের পরিচয়ের অংশ। প্রতিদিন সেখানে এসে দাঁড়ান স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী, মুক্তিযোদ্ধা ও সাধারণ মানুষ। কেউ ফুল দিয়ে, কেউ নীরবে মাথা নত করে স্মরণ করেন এ দেশের এক নিভৃত বীরকে। জাতীয় দিবসগুলোতে এলাকাবাসীর সমবেত শ্রদ্ধা জানানোর প্রধান কেন্দ্রও এটি।স্থানীয় বাসিন্দা তপন কুমার পবন বলেন, এতদিন গল্পই ছিল আমাদের ভরসা। এখন সেই গল্পের স্থায়ী ঠিকানা হয়েছে স্মৃতি স্তম্ভে। মুক্তিযোদ্ধা আব্দুস সামাদ জানান, আকরাম শুধু একজন শহীদ নন, তিনি সত্যিকারের দেশপ্রেমিক। কখনেও ইতিহাসের পাতা থেকে হারিয়ে যাবে না, বরং সময়ই তাকে ফিরে আনে বার বার। সেই মোড়ে দাঁড়ালে এখনও মানুষের মনে ফিরে আসে ১৯৭১-এর রক্তাক্ত দিন। বাতাস যেন আজও স্মরণ করিয়ে দেয়—বাংলাদেশের স্বাধীনতা এসেছে অসংখ্য আকরামের যন্ত্রণা, সাহস ও আত্মোৎসর্গের বিনিময়ে।
সম্পাদক ও প্রকাশক: এ বি এম মনিরুজ্জামান
নির্বাহী সম্পাদক: রিপন রুদ্র
যুগ্ম সম্পাদক: জাকিয়া সুলতানা (লাভলী)
কপিরাইট © ২০২৬ দৈনিক সংবাদ দিগন্ত । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত